
খন্দকার জলিল, জেলা ব্যুরো প্রধান, পটুয়াখালী:-
পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) সংসদীয় আসনের রাজনীতিতে দিন দিন বাড়ছে উত্তেজনা ও হিসাব-নিকাশ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রাথমিকভাবে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক মাঠে বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো দলের তৎপরতা চোখে পড়েনি। তবে সময়ের ব্যবধানে এখন দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে বর্তমানে মাঠে সক্রিয় রয়েছে মূলত বিএনপি। আওয়ামী লীগ এখনো প্রকাশ্য রাজনীতিতে অনুপস্থিত থাকলেও সেই শূন্যতা পূরণে ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছে গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
বিএনপিতে মনোনয়ন ঘিরে টানাপোড়েন
পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন দীর্ঘদিন ধরে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। বিএনপি ইতোমধ্যে দুই ধাপে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করলেও এই আসনে এখনও কাউকে চূড়ান্ত করা হয়নি। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জোটের শরিক দলের জন্য আপাতত আসনটি খালি রাখা হয়েছে।
তবে হাসান মামুন একাধিক জনসভায় দাবি করেছেন, গত ৪৬ বছরে বিএনপি এই আসন থেকে নির্বাচিত হতে পারেনি, কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবার বিজয়ের বড় সুযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় জোটের স্বার্থে আসন ছেড়ে দিলে গলাচিপা-দশমিনায় বিএনপির সাংগঠনিক অস্তিত্ব অদুর ভবিষ্যতের জন্য হুমকির মুখে পড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, দলীয় মনোনয়ন না পেলেও বিএনপির জনসমর্থন নিয়ে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন।
ইতোমধ্যে গলাচিপা ও দশমিনার প্রতিটি ইউনিয়নে তার আয়োজিত জনসভা জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের জোরালো দাবি—হাসান মামুনকেই এই আসন থেকে মনোনয়ন দিতে হবে। তাদের বক্তব্য, “মার্কা যেটাই হোক, হাসান মামুনই আমাদের প্রার্থী।”
গণঅধিকার পরিষদের শক্ত অবস্থান
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের জন্মভূমি গলাচিপা। আওয়ামী সরকার পতনের পর থেকেই তিনি এই আসনে ধারাবাহিকভাবে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন জনসভায় তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, ট্রাক প্রতীক নিয়ে তার দল এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে।
নুরুল হক নুরের দাবি, এ অঞ্চলে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে এবং নিজ দল থেকে নির্বাচন করলে তিনি বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে সংসদে যেতে পারবেন।
জোট প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গণঅধিকার পরিষদ কোন দলের সঙ্গে জোটে যাবে না এবং তিনশ আসনেই দলীয় প্রার্থী দেবে।
জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রস্তুতি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পটুয়াখালী জেলা আমির, গলাচিপা ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যাপক মো. শাহ আলম মিয়া দাড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে এককভাবে নির্বাচন করার লক্ষ্যে জোর প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ব্যাপক গণসংযোগ করছেন এবং দাবি করছেন, গলাচিপা-দশমিনায় তার সাবেক ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় ভোটব্যাংক রয়েছে, যা অন্য কোনো প্রার্থীর নেই। এ ভোটব্যাংকের ওপর ভর করেই তিনি শতভাগ বিজয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। দলটির মনোনীত প্রার্থী মুফতি আবুবকর সিদ্দিকী ইতোমধ্যে ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন, জনগণ এখন ইসলামী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে এবং এবার হাতপাখা প্রতীকে ভোট দিয়ে তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করবে।
গোলাম মাওলা রনিকে ঘিরে জল্পনা
আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নীরব থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর তার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০১৮ সালে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার পর তিনি ঢাকায় চলে যান এবং এলাকায় তার উপস্থিতি ছিল না।
তবে গলাচিপা-দশমিনায় তার কিছু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং দাবি করছেন, দলীয় পরিচয় ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলে গোলাম মাওলা রনি এ আসন থেকে জয়ী হতে৷ পারবেন।
জনমত জরিপে এগিয়ে হাসান মামুন
স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে হাসান মামুন বর্তমানে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন। তবে চূড়ান্ত চিত্র নির্ভর করবে মনোনয়ন দাখিল ও প্রতীক বরাদ্দের পর।
সব মিলিয়ে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে একাধিক শক্ত প্রার্থীর উপস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছেই। এখন দেখার বিষয়—শেষ পর্যন্ত ভোটের সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।