
সৈয়দ উসামা বিন শিহাব স্টাফ রিপোর্ট
মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আজ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ, ফজিলতপূর্ণ ও তাৎপর্যবাহী রাত—পবিত্র শবে বরাত। গুনাহ মাফ, জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি এবং মহান আল্লাহর অশেষ রহমত লাভের এক বিরল সুযোগ নিয়ে আসে এই মহিমান্বিত রজনী। আরবি ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। অর্থাৎ শবে বরাত হলো এমন এক রাত, যে রাতে বান্দা তার পাপের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং আল্লাহর করুণার ছায়ায় আশ্রয় লাভ করে।
হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে পালিত হয় শবে বরাত। ইসলামি বিশ্বাস ও বর্ণনা অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের আমলনামা, রিজিক, জীবন-মৃত্যু এবং আগামী এক বছরের ভাগ্যলিপি নির্ধারণ করেন। এ কারণেই এই রাতকে বলা হয় ‘লাইলাতুল বরাত’—অর্থাৎ তাকদির নির্ধারণের রাত। এই রাতের গুরুত্ব ও মর্যাদা মুসলমানদের জন্য গভীর আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, শবে বরাতের রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করে বান্দাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন—কেউ কি ক্ষমা প্রার্থনা করছ, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব; কেউ কি রিজিক চাইছ, আমি তাকে রিজিক দান করব; কেউ কি বিপদে আছ, আমি তাকে মুক্তি দেব। এ রাতে আল্লাহর রহমত এমনভাবে বর্ষিত হয় যে, কালব গোত্রের মেষের পশমের সংখ্যার চেয়েও অধিক মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এটি মহান আল্লাহর সীমাহীন দয়া, ক্ষমাশীলতা ও করুণার এক অতুলনীয় প্রমাণ। শবে বরাত কোনো উৎসবমুখর বা আনুষ্ঠানিকতার রাত নয়; বরং এটি নীরব ইবাদত, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের এক গভীর সাধনার রাত। এই রাতে বান্দার উচিত নফল নামাজ আদায় করা, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা, জিকির-আজকার ও দরুদ পাঠে নিজেকে নিয়োজিত রাখা এবং খাঁটি অন্তর থেকে তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে অতীতের গুনাহের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা। পাশাপাশি বাবা-মা, পরিবার, সমাজ, দেশ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় দোয়া করা এবং পরদিন ১৫ শাবান নফল রোজা রাখাও ফজিলতপূর্ণ আমলের অন্তর্ভুক্ত, যা হাদিস দ্বারা সমর্থিত। ধর্মীয় আলেম ও বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে মনে করেন, শবে বরাত পালনের নামে আতশবাজি, হৈ-হুল্লোড়, অনর্থক আচার কিংবা কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। এই রাত প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং আত্মসমালোচনা, অনুশোচনা এবং আল্লাহর দিকে পূর্ণভাবে ফিরে আসার জন্য। অন্যকে কষ্ট দেওয়া বা অযথা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা এই পবিত্র রজনীর আত্মার পরিপন্থী।
শবে বরাত আমাদের শিক্ষা দেয় অহংকার পরিত্যাগ করে আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে, হিংসা-বিদ্বেষ ও বিদ্বেষমুক্ত হৃদয় নিয়ে নতুনভাবে পথচলা শুরু করতে, মানুষের হক আদায়ে সচেতন হতে এবং একটি পাপমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও তাকওয়াপূর্ণ জীবন গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করতে। এই পবিত্র রজনীতে আসুন, আমরা সবাই নিজেদের ভুলত্রুটি ও গুনাহের হিসাব করি, আল্লাহর অশেষ রহমতের ছায়ায় আশ্রয় নিই এবং তাঁর সন্তুষ্টিকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করি।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র শবে বরাতের প্রকৃত ফজিলত অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।