
মোঃ রাকিবুল ইসলাম
সিনিয়র রিপোর্টার:-
আজ ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ। সমগ্র বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হচ্ছে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিনটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তার শিক্ষা ও গৌরব আজ নতুন প্রজন্মের জন্য এক অম্লান ইতিহাস হয়ে আছে।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমি:-
ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিন্যাসে বাংলা ভাষাভাষী জনগণ পাকিস্তানের একাংশ হিসেবে যুক্ত হয়। তখনকার সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়, যা বাঙালি জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা ধারণ, মিছিল ও শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন। তৎকালীন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিল, কিন্তু তা অমান্য করে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় বের হন। পুলিশি গুলিতে ছয়জন শিক্ষার্থী শহীদ হন, এবং অনেকেই আহত হন। এই তাণ্ডব ভাষা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা অর্জনের সংগ্রামকে এগিয়ে নেয়।
শহীদদের আত্মত্যাগ:-
সকল ইতিহাস গবেষণা ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২-তে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন:
আব্দুস সালাম,আবুল বরকত,রফিক উদ্দীন আহমেদ,শফিউর রহমান,আব্দুল জব্বার।
তাদের আত্মত্যাগ একুশে ফেব্রুয়ারিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে। তৎকালীন দিনে আরও অনেকে আহত হন এবং পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রাণ বিলিয়ে দেন। তাঁদের সাহসিকতা আজও স্মৃতির পাতায় অম্লান।
দিবস পালনের দেশীয় প্রথা:-
বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি। সমগ্র জাতি দিনটিকে গভীর শ্রদ্ধা ও সৌজন্যের সঙ্গে পালন করে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি অফিস এবং সরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকে।
সকাল থেকে মানুষের ভিড় শুরু হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং শহীদদের স্মৃতিসৌধে মাল্যদান ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। অনেকে কালো ব্যাজ ধারণ করে শহীদদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মচারী, ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল, মালা এবং মোমবাতি দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। অনেকে শোকাহত মন নিয়ে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…” গানটি মুখে গেয়ে শহীদদের আত্মাকে সম্মান জানান।
শহরের বাইরে, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার শহীদ মিনারেও শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের আয়োজন হয়। স্কুল ও কলেজগুলোতে বিশেষ আলোচনা সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে ভাষার মর্যাদা, জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বিষয়ে বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:-
১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ঘোষণা করে যে, ২১ ফেব্রুয়ারি হবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, যাতে জনগণের ভাষা ও ভাষিক বৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়। প্রায় একশ’রও বেশি দেশ এই দিবসের সমর্থন জ্ঞাপন করে। আজ এটি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
দিবসটি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক সংস্থা ও ভাষা অধিকার সংস্থায় সেমিনার, প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হয়। এর লক্ষ্য হলো “ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা”, “মানবাধিকার” এবং “ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা” নিশ্চিত করা।
শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ব:-
মাতৃভাষা দিবস শুধুমাত্র স্মৃতিদিবস নয়; এটি একটি শিক্ষা যা সাহস, ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে মানিয়ে নিতে শেখায়। শিক্ষক ও অভিভাবকরা মনে করান, বর্ণমালা শেখা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং ভাষার মাধ্যমে নিজের পরিচয় গড়ে তোলা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। ভাষা আন্দোলন ছিল সংগ্রাম, কিন্তু এটি স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত।
শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শ্রেণিকক্ষে পড়ে এবং শহীদদের আত্মত্যাগ থেকে জাতীয় অহংকার ও দায়িত্ববোধ অর্জন করে। ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভাষা কোনো রাষ্ট্রের আত্মা এবং পরিচয়ের প্রতীক।
চিরন্তন শ্রদ্ধা:-
আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমরা স্মরণ করি ১৯৫২ সালের সেই বীর শহীদদের, যারা নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে বাংলা ভাষাকে মর্যাদা দিয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ আমাদের শিক্ষা দেয় — ভাষা, পরিচয় ও ঐক্যের জন্য লড়াই করলে জয় অনিবার্য। মানুষের হৃদয়ে চিরজীবী থাকবে “একুশে ফেব্রুয়ারি” – মানবিক মর্যাদা ও ভাষিক স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে।
শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা — আজ ও সর্বদা।