
মো. আছিফ মল্লিক
নিজস্ব প্রতিনিধি:-
তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে এটিকে আইন হিসেবে কার্যকর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে অধ্যাদেশটি যেন কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ না থাকে—সে লক্ষ্যে আসন্ন সংসদের প্রথম অধিবেশনে এটি পাস করে আইনে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন পেশাজীবী নারী নেতৃবৃন্দ।
গত মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নারী মৈত্রীর আয়োজনে ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫ ও পরবর্তী করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব মতামত উঠে আসে। সভায় বিভিন্ন নারী ফোরামের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিসিআইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান এবং ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে)–বাংলাদেশের লিড পলিসি অ্যাডভাইজর মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০২৫–এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ১৩ লাখেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (১৫ বছর বা তার ঊর্ধ্বে) তামাক ব্যবহার করে। এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে, যা দৈনিক গড়ে ৫৪৫ জনেরও বেশি। অন্যদিকে, তামাক ব্যবহারজনিত কারণে প্রতিবছর দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই সর্বগ্রাসী ক্ষতির কারণে তামাককে একটি ভয়াবহ মহামারী হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।
এমতাবস্থায় উপদেষ্টা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকে (২৪ ডিসেম্বর ২০২৫) স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদিত হয়।
অনুমোদিত অধ্যাদেশে ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টসের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘তামাকজাত দ্রব্য’-এর সংজ্ঞার আওতায় নিকোটিন পাউচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপানের পাশাপাশি সকল প্রকার তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান রাখার বিধান সরকার নির্ধারিত শর্তাধীন করা হয়েছে। এছাড়া ‘পাবলিক প্লেস’ ও ‘পাবলিক পরিবহণ’-এর সংজ্ঞা ও অধিক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শনসহ ইন্টারনেট বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের সকল প্রকার বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রসার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের গায়ে স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর পরিসর বিদ্যমান ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করার বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, এই অধ্যাদেশের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সংসদে পাস করে আইনে রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি।
সভায় স্বাগত বক্তব্যে নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলি বলেন, তামাকের ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০২৫-এর তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ১১ শতাংশেরও বেশি নারী তামাকজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করে। প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু এই তামাকের কারণে ঘটে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করেছে। এজন্য তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং আশা প্রকাশ করেন, অধ্যাদেশটির কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ মোমেনা মনি বলেন, তামাক খাত থেকে সরকার প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অকাল মৃত্যুর কারণে ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল ক্ষতি ও প্রাণহানি রোধে অন্তর্বর্তী সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এই অবস্থান যদি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও অব্যাহত রাখে, তবে সংসদে আইনটি পাস হতে কোনো বাধা থাকবে না। এজন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ আইনের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অধ্যাদেশটি পাস করে আইনে রূপান্তর করতে হবে। এ লক্ষ্যে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে তুলতে হবে, যাতে এটি একটি শক্তিশালী জনদাবিতে পরিণত হয়। তখন সরকার এটি উপেক্ষা করতে পারবে না।
এছাড়াও সভায় বক্তব্য দেন সিটিএফকে-বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার আব্দুস সালাম মিয়া, নারী মৈত্রী মাদার্স ফোরামের আহ্বায়ক শিবানী ভট্টাচার্য, টিচার্স ফোরামের আহ্বায়ক ড. খালেদা ইসলাম এবং ইয়ুথ অ্যাডভোকেট রাইসুল ইসলাম ও শাহরীন ফেরদৌস।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, অধ্যাদেশটির বাস্তবায়ন এবং আইনে পরিণত করতে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।