
মো. জিয়াউদ্দিন
জেলা বিশেষ প্রতিনিধি (ভোলা):
ভোলা জেলার ঐতিহ্যবাহী ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চতলা, করিমগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে শীতকাল এলেই খেজুরের রসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে গ্রামীণ জীবনের মধুর স্মৃতি। কনকনে শীতের সকালে খেজুরের টাটকা রস পান, সেই রস দিয়ে তৈরি গুড়, পাটালি, পিঠা-পায়েস ও রঙিন বাহারি পিঠার স্বাদ গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ভোলাতেও শীত জেঁকে বসতে শুরু করেছে। শীতের আগমনে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিয়ে গাছিদের মধ্যে শুরু হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য।
ভোলার চরফ্যাশন ও লালমোহন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শীত মৌসুমকে ঘিরে খেজুরের রস আহরণ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতি চলছে। মোহাম্মদপুর, হাজারীগঞ্জ, জাহানপুর, আসলামপুর ও ওমরপুর ইউনিয়নের কিছু এলাকায় খেজুরের রস পাওয়া যায়। ভোলা জেলা সদর থেকে প্রায় ৪৮ মাইল পথ অতিক্রম করে কুঞ্জেরহাট থেকে তজুমদ্দিন সড়কের দুই পাশ, লালমোহন চতলা এবং মঙ্গল শিকদার সড়কসংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে শত শত খেজুরগাছ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এসব গাছে রস সংগ্রহের জন্য নলি তৈরির কাজে ব্যস্ত দেখা যায় কয়েকজন গাছিকে।
গাছিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীতের শুরুতে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে খেজুরগাছ কাটার কাজ শুরু হয়। কয়েক দিন পর কাটা অংশে চোখ বা নলি তৈরি করা হয়। এই নলি বা চুঙ্গির মাধ্যমে রস ঝরে পড়ে ঝোলানো মাটির হাঁড়ি বা ছোট কলসিতে। হাঁড়ি ঝোলানোর পরদিন ভোরে গাছিরা গিয়ে রসসহ হাঁড়ি নামিয়ে আনেন।
লালমোহন উপজেলার চতলা ও লেঙ্গুটিয়া এবং করিমগঞ্জসংলগ্ন এলাকায় খেজুরগাছে নলি তৈরির কাজ করছিলেন চতলা গ্রামের গাছি নাজিম ও ইকবাল। তাঁরা জানান, গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন। আবার অনেকেই গাছতলা থেকেই সকালের নাস্তার জন্য টাটকা রস কিনে নিয়ে যান।
গাছি ইকবাল বলেন, “৯–১০ দিন হলো রস সংগ্রহ শুরু করেছি। শুরুর দিকে রস কম পড়ে। শীত বাড়লে রসও বেশি হবে, মিষ্টিও হবে বেশি।”
লালমোহন উপজেলার চতলা গ্রামের গাছি ইকবাল (৪৫) এবার ২০টি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করবেন। তিনি বলেন, “প্রায় ২৫ বছর ধরে শীত এলেই এ কাজ করি। এর মধ্যে পাঁচটি গাছ নিজের, বাকি ১৫টি গাছ অন্যের কাছ থেকে লিজ নেওয়া। লিজদাতাকে মৌসুম শেষে ১০ কেজি গুড় ও কিছু রস দিলেই হয়।” তিনি জানান, খুব বেশি লাভ না হলেও এটি তাঁদের মৌসুমি আয়ের একটি মাধ্যম।
তবে আগের তুলনায় এলাকায় খেজুরগাছের সংখ্যা কমে গেছে বলে জানান তিনি। অনেকেই গাছ কেটে ফেলেছেন, কিন্তু নতুন করে সেই পরিমাণ গাছ লাগানো হয়নি। শীত ছাড়া খেজুরগাছ থেকে তেমন কোনো আয় না হওয়ায় অনেকে গাছ রাখতে আগ্রহী নন। আবার কেউ কেউ গাছ কেটে মাটির ঘর তৈরির কাজে ব্যবহার করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ভোলায় প্রায় ১০০ হেক্টর জমিজুড়ে খেজুরগাছ রয়েছে। চলতি বছর এসব গাছ থেকে ৭৫০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপপরিচালক জানান, খেজুরগাছের উপরিভাগের নরম অংশে চাঁছ দিয়ে রস নামানো হয়। একবার চাঁছ দিলে দুই থেকে তিনবার রস পাওয়া যায়। সাধারণত গাছ পূর্ব ও পশ্চিম দিকে কাটা হয়, যাতে সূর্যের আলো সরাসরি পড়ে এবং রস বেশি মিষ্টি হয়। রস সংগ্রহের স্থান নেট দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শও দেন তিনি, যাতে পাখি বা বাদুড় মুখ দিতে না পারে এবং নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি কমে।
শীতের সকাল আর খেজুরের রস—এই দুয়ের মিলনেই গ্রামবাংলার ঐতিহ্য আজও জীবন্ত হয়ে ওঠে ভোলার জনপদে।