
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি এবং খেলাপি ঋণের উদ্বেগজনক চিত্র নিয়ে জাতীয় সংসদে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হবিগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
রেজা কিবরিয়া বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো দেশের মোট ঋণের ৬ শতাংশ খেলাপি হলে তা উদ্বেগজনক হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশে এই হার ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। নিজের ৪৫ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে কঠোর ও কার্যকর সংস্কার না আনলে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না।
ব্যাংকিং খাতের অদক্ষতাকে অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের কাছ থেকে ৫ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করা হলেও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ সুদ নেওয়া হচ্ছে। একটি দক্ষ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান এতটা বেশি হওয়ার কথা নয়। তার মতে, এই অদক্ষতার কারণেই প্রকৃত ও সৎ উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার উদ্দেশ্যে ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপির সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে কোনো ঋণের সুদ ৯০ দিন পরিশোধ না করলে সেটিকে খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হতো। বর্তমানে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে এক বছর করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাজেট আলোচনায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন রেজা কিবরিয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোর তুলনায় মুদ্রাস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বিনিময় হার আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
তিনি আয়বৈষম্য কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়ে বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে হবে। শুধু বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, শপিং মল কিংবা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বিশ্ব অর্থনীতির চলমান মন্দা ও ধীরগতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রস্তাবিত বাজেট খুব একটা বিস্ময়কর নয়। তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে তিনি বাণিজ্যিক বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পসুদে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
সংসদে তার এ বক্তব্যের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান।