
খন্দকার জলিল, জেলা প্রধান,
পটুয়াখালী:
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের ‘কল্যাণ কলস আদর্শ গ্রামটি’ এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। প্রভাবশালীদের বাধা, জমি দখলের চক্রান্ত এবং দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে গৃহহীনদের জন্য নির্মিত এই আশ্রয়স্থলটি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বর্তমানে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় অধিবাসীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন সরকার এলাকার আশ্রয়হীন ও হতদরিদ্র মানুষের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রকল্পটির অধীনে ৪৫টি পরিবারকে ঘর বরাদ্দ দেয়। পরিবারগুলো সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসলেও দীর্ঘ ২৫ বছরে কোনো সরকারি সংস্কার না হওয়ায় ঘরগুলো জরাজীর্ণ ও বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নিজ অর্থায়নে ঘর সংস্কারের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন জানান। সরকারি কোনো বরাদ্দ না থাকায় তৎকালীন ইউএনও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের অনুমতি সাপেক্ষে নিজ খরচে ঘর সংস্কারের পরামর্শ দেন। চেয়ারম্যানের অনুমতি পেয়ে মো. শহিদ হাওলাদার, মোসা. সাকলিমা বেগম, মো. কুদ্দুস মোল্লা, মো. ইউসুফ মৃধা ও মো. আলতাফ সিকদারসহ কয়েকজন স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের বাঁধা উপেক্ষা করে কোনো রকমে ঘর সংস্কার করে বসবাস শুরু করেন। তবে বাকি পরিবারগুলো ঘর মেরামত করতে গেলে তারা সরাসরি বাঁধা প্রদান করে।
ধারাবাহিক বাধার কারণে বাধ্য হয়ে ১০ থেকে ১৫টি হতদরিদ্র পরিবার ঘর ছেড়ে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাড়ি জমিয়েছে। তাদের পরিত্যক্ত ঘরগুলো এখন কেবল কয়েকটি খুঁটির ওপর টিকে রয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জাহাঙ্গীর সরদার নামের এক ভুক্তভোগী কাঠ সংগ্রহ করে ঘর মেরামতের চেষ্টা করলে আব্দুল গনি হাওলাদার, কালাম হাওলাদার ও হালিম রাড়িসহ স্থানীয় কয়েকজন তাদের সঙ্গীদের নিয়ে বাঁধা দেয়। ফলে এই বর্ষা মৌসুমে বিয়ের উপযুক্ত মেয়েকে নিয়ে টিনের চালে পলিথিন টাঙিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন জাহাঙ্গীর। যদিও গনি হাওলাদার প্রতিবেদকের সামনে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এর আগে গত ইংরেজি ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর নিজ ঘর মেরামত করতে গিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের শিকার হন মো. কুদ্দুস মোল্লার পরিবার। অভিযোগ রয়েছে, আব্দুল হালিম রাড়ির নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলায় চালায়। এতে কুদ্দুস মোল্লার স্ত্রী মিনারা বেগমের বাম কান কেটে যায়। এ ঘটনায় মিনারা বেগম বাদী হয়ে গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং- এম,পি ৩৪/২৫)
পরবর্তীতে আদালত থানা পুলিশকে এজাহার নিবন্ধনের নির্দেশ দিলেও আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী পরিবারটি। সাংবাদিকরা এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে হালিম রাড়ির বাড়িতে গেলে ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আব্দুল হালিম রাড়ি ও গনি হাওলাদারসহ চক্রটি আদর্শ গ্রামের জমিকে নিজেদের ভুয়া রেকর্ডীয় দাবি করে আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করেছে (মামলা নম্বর- ১২৪/২৫) স্থানীয়দের দাবি, দরিদ্র পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করতেই প্রভাবশালীরা মিথ্যা মামলার আশ্রয় নিয়েছে।
বর্তমানে কল্যাণ কলস আদর্শ গ্রামের বাকি পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত দখলদারদের হুমকি ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বহু কষ্টে গড়ে ওঠা এই আশ্রয়ণ প্রকল্পটি রক্ষায় এবং জরাজীর্ণ ঘরগুলো মেরামতের সুযোগ করে দিতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।