
খন্দকার জলিল, জেলা প্রধান, পটুয়াখালী: পটুয়াখালীর রাংগাবালী উপজেলার চর মোন্তাজ ইউনিয়নের চর বেষ্টিন গ্রামে বেড়ে ওঠা ফারহান আরবিন হেলাল (২৮) বাবা মো. সবুজ খন্দকার। পরিবারের অতি আদরের সন্তান তিনি। শুধু পরিবারের কাছেই নয়, নম্র-ভদ্র স্বভাব, মার্জিত আচরণ ও মেধার কারণে পুরো এলাকার মানুষের কাছেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। গলাচিপা সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে বিএ পাশ করে চাকরির জন্য অপেক্ষা করছিলেন, আর এর ফাঁকে বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করতেন। মাত্র দেড় বছর আগে এক ফুটফুটে মেয়কে বিয়ে করে সুখের সংসার বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলেন হেলাল। বর্তমানে তাঁর স্ত্রী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আর কিছুদিন পরেই তাঁদের কোলজুড়ে আসবে নতুন অতিথি, আলোয় ভরে উঠবে তাদের সুখের সংসার—এমনই এক বুক ভরা আশা ছিল হেলালের। কিন্তু এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিমেষেই শেষ হয়ে গেল সব স্বপ্ন। অকালেই ঝরে গেল হেলালের তাজা প্রাণ। বুধবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে নিজের জমির ধানের চারা দেখতে ক্ষেতে গিয়েছিলেন হেলাল। ক্ষেতের আইল দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ করেই তাঁকে একটি বিষাক্ত সাপ দংশন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, রাংগাবালী উপজেলায় কোনো আবাসিক হাসপাতাল নেই। সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসার জন্য নিতে হয় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী গলাচিপা উপজেলা হাসপাতালে। দুর্গম এই নদীপথে যাতায়াতের জন্য লঞ্চ, ট্রলার ও স্পিডবোট থাকলেও সব সময় তা পাওয়া যায় না। জরুরি মুহূর্তে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া বা স্রোতের বিপরীতে ট্রলারে গলাচিপা পৌঁছাতে সময় লাগে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। হেলালের ক্ষেত্রেও সময়মতো ট্রলার না পাওয়ায় স্বজনরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েন। পরবর্তীতে বোয়ালিয়া স্লুইসঘাট থেকে ফোন করে স্পীডবোটের ব্যবস্থা করে তাঁকে গলাচিপা হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। কিন্তু যাতায়াতেই অনেকটা সময় পার হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসকদের আর কিছুই করার ছিল না; বাঁচানো সম্ভব হয়নি হেলালকে। মুহূর্তের মধ্যে হেলালের এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং বন্ধুদের মাঝে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। “এখন সচেতন মহলের জোরালো প্রশ্ন—হেলালের এই অকাল মৃত্যুর জন্য আসলে কে দায়ী? • রাংগাবালী উপজেলায় একটি আবাসিক হাসপাতাল না থাকা? • নাকি জরুরি মুহূর্তে উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব? • নাকি কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অবহেলা—কোনটি দায়ী হেলালের এই অকাল মৃত্যুর জন্য?” শুধু হেলাল একা নন; রাংগাবালী উপজেলার চর মোন্তাজ ইউনিয়নসহ আশপাশের দ্বীপাঞ্চলে এমন হাজারও ‘হেলাল’ বসবাস করেন। উপজেলায় কোনো পূর্ণাঙ্গ আবাসিক হাসপাতাল না থাকায় এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত অনেক গর্ভবতী মা ও হঠাৎ অসুস্থ হওয়া মানুষ চিকিৎসার অভাবে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। আর যারা বর্তমানে সুস্থ আছেন, তারাও প্রতি মুহূর্তে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন—কখন কাকে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়! এলাকাবাসীর এখন একটাই দাবি, এই দ্বীপ অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং অকাল মৃত্যু রোধে সরকার যেন দ্রুত একটি আবাসিক হাসপাতাল স্থাপন করে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা আধুনিকায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।