
মোঃ রফিকুল ইসলাম রতন সিনিয়র রিপোর্টার আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ময়মনসিংহে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা এবং ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডবিষয়ক সচেতনতামূলক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সোমবার (১৩ অক্টোবর) এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মোহাম্মদ গোলাম মাছুম প্রধান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আজিম উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শিরিন আক্তার, পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ দুলাল আকন্দ এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দীসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা। দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত র্যালির মাধ্যমে দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস, আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির বার্তা তুলে ধরা হয়। পরে আলোচনা সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি, সমন্বিত উদ্যোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাতের পাশাপাশি ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের মতো আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা জরুরি। দুর্যোগের সময় আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া এবং উদ্ধারকারী সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। তাঁরা আরও বলেন, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং দুর্যোগের আগে ঝুঁকি চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া এবং নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বক্তারা উল্লেখ করেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম সচল রাখা, জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করা এবং ভূমিকম্পের সময় নিরাপদে অবস্থান ও ভবন থেকে বের হওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সবার ধারণা থাকা জরুরি। দিবসটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডবিষয়ক সচেতনতামূলক মহড়া। মহড়ার মাধ্যমে আকস্মিক দুর্যোগের সময় কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে, কীভাবে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা ব্যবহারিকভাবে তুলে ধরা হয়। ভূমিকম্পের সময় মাথা ও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সুরক্ষিত রাখা, সম্ভব হলে মজবুত টেবিল বা নিরাপদ আশ্রয়ের নিচে অবস্থান করা এবং কম্পন চলাকালে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি না করার বিষয়ে সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে কম্পন থেমে গেলে পরিস্থিতি বুঝে সিঁড়ি ব্যবহার করে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দূরে থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া, নিরাপদ পথে ভবন থেকে বেরিয়ে আসা, ধোঁয়াযুক্ত স্থানে সতর্ক থাকা এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত কর্মীদের সহায়তা নেওয়ার বিষয়গুলোও মহড়ায় গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাস্তবভিত্তিক মহড়ার মাধ্যমে দুর্যোগের সময় মানুষের করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে আতঙ্ক কমানো, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উদ্ধার তৎপরতা কার্যকরভাবে পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আগাম প্রস্তুতি জোরদার এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বক্তারা বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক তৈরি, উদ্ধার সরঞ্জামের সহজলভ্যতা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মহড়া আয়োজনের মাধ্যমে প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁরা আরও বলেন, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি পরিবারকে জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মেনে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ময়মনসিংহে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত র্যালি, আলোচনা সভা ও সচেতনতামূলক মহড়ার মধ্য দিয়ে দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস, আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ এবং নিরাপদ সমাজ গঠনে সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। নিয়মিত এমন কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলায় জনগণের সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।