
মোঃ জিয়াউদ্দিন, জেলা বিশেষ প্রতিনিধি, ভোলা:
ভোলা–৩ (লালমোহন–তজুমদ্দিন) আসনে সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম)। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, রণাঙ্গনের বীরত্বগাঁথা, সততা ও স্থানীয় উন্নয়নকেন্দ্রিক নেতৃত্ব—এই তিন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তার জনপ্রিয়তা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি প্রমাণ করেছেন, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সততা ও গ্রহণযোগ্যতাই তার বিজয়ের মূল শক্তি। নির্বাচনী জনসভাগুলোতে তিনি বারবার বলেন,
“শুধু আমাকে দেখে ভোট দেবেন, অন্য কারো দিকে তাকিয়ে নয়। আমি একজন সৎ মানুষ। জীবনে কখনো ঘুষ খাইনি, ঘুষ দিইনি। আমার কর্মীদের কারণে আমাকে শাস্তি দেবেন না—আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে ভোট দিন। ইনশাআল্লাহ আপনাদের ভোটের প্রতিদান দেব।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে কিছু নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ড নিয়ে ভোটারদের মধ্যে যে অনীহা তৈরি হয়েছিল, তার এই স্পষ্ট ও দৃঢ় বক্তব্য সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে আশার সঞ্চার করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন—কোনো জুলুম, অন্যায় বা সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন সহ্য করা হবে না।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও তিনি নেতাকর্মীদের কঠোর নির্দেশ দেন, কেউ যেন আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী বা অন্য কোনো দলের সমর্থকদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ না করে। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
নির্বাচন–পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন,
“জনগণের চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই—এ নির্বাচনে তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি এবং স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্বকে সুসংহত রাখতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ অচিরেই সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।”
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত রাখা, তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত ইমেজ—এই তিনটি কারণ তার সাফল্যের মূল। বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার পরিচয় স্থানীয় জনগণের কাছে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে।
সেনাবাহিনীতে মেজর হিসেবে কর্মজীবন শেষে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও কেন্দ্রীয় যোগাযোগ তার শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
রাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও তিনি ছিলেন উজ্জ্বল। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ঢাকা লিগে মোহামেডানের হয়ে এক ম্যাচে ৬ গোল করে (ডাবল হ্যাটট্রিক) ইতিহাস গড়েন। ১৯৬৬–১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলের সহ–অধিনায়ক ছিলেন। মোহামেডানের হয়ে চারবার ঢাকা লিগ জিতেছেন এবং ১৯৭৬ সালে অধিনায়ক হিসেবে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন। ২০০ মিটার দৌড়েও দীর্ঘদিন তার রেকর্ড অক্ষুণ্ণ ছিল। ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন।
পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ও এএফসির সহ–সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ফিফার সঙ্গেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত ছিলেন।
তার বাবা ডা. আজাহার উদ্দিন আহমদ ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাবার হাত ধরেই রাজনীতিতে আসেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এ পর্যন্ত ১০টি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সপ্তমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এবারে পেয়েছেন ১,৪৫,৯৯০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুহাম্মদ নিজামুল হক নাঈম পেয়েছেন ৫৭,৩৫১ ভোট।
তিনি আগে পাট, বাণিজ্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লালমোহন ও তজুমদ্দিনে সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে তার ভূমিকা স্থানীয়দের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে নদীভাঙন প্রতিরোধে তার উদ্যোগ ভোটারদের আস্থা বাড়িয়েছে।
বয়সজনিত কারণে এবারের নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে আগের মতো সক্রিয় থাকতে না পারলেও ভোটাররা তার প্রতি আস্থা রেখেছেন। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন,
“আমি আগের মতো প্রচার করতে পারিনি, মানুষের ঘরে ঘরে যেতে পারিনি। তারপরও জনগণ আমাকে ভালোবেসে ভোট দিয়েছেন। আমি লালমোহন ও তজুমদ্দিনকে দুর্নীতিমুক্ত ও মাদকমুক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”