
রিপন শান | নিজস্ব প্রতিবেদক :–
স্বাধীনতা-ব্যবসা ও ধর্ম-ব্যবসার বিরুদ্ধে জাগ্রত কবিতার প্রত্যয়ে জাতীয় কবিতা পরিষদের নিয়মিত আসর হিসেবে ৬২তম কবিতাপাঠ ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেল ৫টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মুনির চৌধুরী মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
কবি শিমুল পারভীন ও কবি নাহিদ হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে আলোচনা সভায় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন— জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান, সহসভাপতি কবি মানব সুরত এবং আলোচক কবি ও গবেষক ইমরান মাহফুজ।
কবি শিমুল পারভীনের উদ্বোধনী সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর সভাপতির সূচনা বক্তব্যে কবি মোহন রায়হান জানান, আগামী ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় কবিতা উৎসব ২০২৬ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রাজপথ থেকে উঠে আসা ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ এক দশকের বেশি সময় ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রতি নতজানু অবস্থানে চলে গিয়েছিল। কবিদের এই দলদাস ভূমিকা সময়েরই প্রতিফলন ছিল। ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকে ছিল কবিদের এই সমবেত নীরবতার কারণেই। তবে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতারা ফ্যাসিস্টমুক্ত জাতীয় কবিতা পরিষদ পুনর্গঠন করেন।
এরপর কবি নাহিদ হাসান আলোচক ইমরান মাহফুজের পরিচিতি তুলে ধরেন। আলোচনায় ইমরান মাহফুজ ‘কবিতায় বিপ্লব, বিপ্লবের কবিতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বাংলা কবিতার বিপ্লবী ধারার বিবর্তন বিশ্লেষণ করেন। আলোচনায় তিনি কবি হেলাল হাফিজের অমর পংক্তি— “এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়”—এর উল্লেখ করেন।
ইমরান মাহফুজ বলেন, আল মাহমুদের ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ কবিতা স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামে ফিরে এলে গ্রামবাসী বলেছিল—‘তুমি তো আমাদেরই গাঁয়ের ছেলে’। একইভাবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের নায়কদেরও দেশবাসী নিজেদের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই আহ্বানের ভাষা বুঝতে না পারায় দেশ আবারও অনিশ্চিত পথে ভেসে যেতে থাকে।
তিনি আরও বলেন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের রাজপথে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত দুই কবি ছিলেন— রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহন রায়হান। মোহন রায়হানের ‘সাহসী মানুষ চাই’ কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, এই কবিতায় সমাজের ভীরু, দালাল বুদ্ধিজীবী ও সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে। এটি তার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধচিন্তার শক্তিশালী উদাহরণ।
চব্বিশের আন্দোলনে একজন কবিও কারাবন্দি হননি— এ বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে ইমরান মাহফুজ বলেন, “কবি কাপুরুষ হলে পৃথিবীতে নামে অন্ধকার”— মোহন রায়হানের এই পংক্তি গত দেড় দশকের লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার নগ্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘ দেড় যুগ এক সরকারি অন্ধযুগ অতিক্রম করেছি। তবে আন্দোলনে আবারও উচ্চারিত হয়েছে— “বুকে আমার দুরন্ত ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।”
সমাপনী বক্তব্যে কবি মোহন রায়হান বলেন, ৬৬-এর শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান— প্রতিটি সংগ্রামেই তিনি রাজপথে ছিলেন। কিন্তু নেতৃত্বের দুর্বলতা ও জনগণের সঙ্গে সংযোগহীনতার কারণে বারবার আন্দোলন ও বিপ্লব লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, জাতীয় কবিতা পরিষদের স্বাধীনতা-ব্যবসা ও ধর্ম-ব্যবসার বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে কবিতা ও সংগীত পরিবেশন করেন বরেণ্য শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা। কবিতা আবৃত্তি করেন মেহেদী হাসান ও মাশরুর শাকিল।
স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন— কবি মোহন রায়হান, শ্যামল জাকারিয়া, ইউসুফ রেজা, ইমরান মাহফুজ, মেহেদী হাসান, আসাদ কাজল, শিমুল পারভীন, লিলি হক, কামরুজ্জামান, ইমরোজ সোহেল, নীপা চৌধুরী, আতিকুজ্জামান খান, আতিকুল ইসলাম, সবুজ মনির, টিমুনি খান, নাহিদ হাসানসহ মোট ৮৪ জন কবি।