
মো. জিয়াউদ্দিন
জেলা বিশেষ প্রতিনিধি, ভোলা:–
ভোলার ঐতিহ্যবাহী লালমোহন থানাধীন ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চতলা মহাজন খামারবাড়িতে এবার লেবুর বাম্পার ফলন হয়েছে। পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে লেবু চাষ করে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন স্থানীয় চাষিরা। লেবু বিক্রি করে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, যা এলাকায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানান, এ বছর মহাজন খামারবাড়িতে ব্যাপক পরিসরে লেবু চাষ করা হয়েছে। অতীতে এমন ফলন তারা কখনও দেখেননি। গাছে গাছে থোকায় থোকায় লেবু ধরেছে, যা দেখে অনেকেই বিস্মিত।
চরফ্যাশনের চাষি কামাল বলেন, “আমার ব্যক্তিগত লেবুর খামার রয়েছে। কয়েক বছর ধরে লেবু চাষ করছি। তবে এবার ফলন ও লাভ—দুটোই আশানুরূপের চেয়েও বেশি। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।”
কর্তারহাটের এক ব্যবসায়ী জানান, ঢাকায় লেবুর ব্যবসা করতে গিয়ে তার মাথায় আসে—পতিত জমিতে এমন কিছু চাষ করা যায় কি না, যা লাভজনক হওয়ার পাশাপাশি এলাকার কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। প্রথমে ড্রাগন ফল চাষের পরিকল্পনা থাকলেও বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে লেবু চাষ শুরু করেন।
এক একর (১০০ শতাংশ) জমিতে ‘চায়না থ্রি’ ও ‘সিডলেস এলাচি’ (কাগজি লেবু) জাতের ৬০০টি কলম চারা প্রতিটি ৫০ টাকা দরে সংগ্রহ করে রোপণ করা হয়। বছর ঘুরতেই বাগানে অভাবনীয় ফলন দেখা যায়।
প্রতিটি গাছে বছরে ১,০০০ থেকে ১,৫০০টি পর্যন্ত লেবু ধরে। পরিপক্ব হলে পাইকাররা বাগান থেকেই প্রতিটি লেবু ৩ থেকে ৪ টাকা দরে কিনে নেন। মৌসুমভেদে দাম ১০ টাকা পর্যন্ত ওঠে।
কামাল জানান, প্রতি সপ্তাহে দুই হাটে প্রায় ৮ হাজার লেবু বিক্রি হয়। মাসে গড়ে ৩২ হাজার লেবু বিক্রি করে প্রায় ৯৬ হাজার টাকা আয় হয় (প্রতি লেবু ৩ টাকা হিসেবে)। সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা নিট লাভ থাকে।
লেবু বাগানে অতিরিক্ত পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। সার ও ওষুধের ব্যবহারও তুলনামূলক কম। মাঝে মাঝে আগাছা পরিষ্কার করলেই যথেষ্ট। ১২ মাসই ফলন পাওয়া যায় বলে সারা বছর আয় সম্ভব।
এছাড়া প্রতিটি গাছ থেকে প্রায় ২৫টি করে কলম চারা উৎপাদন করা যায়। প্রতিটি চারা ৭০–৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়, যা একসঙ্গে বড় অঙ্কের আয় এনে দেয়। সব মিলিয়ে এক একর জমি থেকে বছরে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব বলে জানান কামাল। তার মতে, লেবু চাষের প্রাথমিক খরচ এক বছরের মধ্যেই উঠে আসে।
তিনি বেকার যুবকদের উদ্দেশে বলেন, “চাকরির পেছনে না ছুটে পতিত জমিতে লেবু চাষ শুরু করলে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।”
পাইকারি বিক্রেতা জামাল জানান, প্রতিদিন তিনি ২৫০ থেকে ৩৫০টি লেবু বিক্রি করেন। শরবত ও ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য লেবুর চাহিদা বেশি। তিনি কামালের বাগান থেকে সপ্তাহে ২ থেকে ৩ হাজার লেবু সংগ্রহ করেন। চাহিদা বেশি থাকায় তারাও ভালো লাভ পাচ্ছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ‘চায়না থ্রি’ ও ‘সিডলেস এলাচি’ জাতের গাছে সারা বছর ফলন পাওয়া যায় এবং সার-ওষুধের প্রয়োজন কম হওয়ায় এটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল। ভোলা জেলায় বর্তমানে ২৭ হেক্টর জমিতে লেবুর আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে ভোলা সদর উপজেলায় ১০ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ হচ্ছে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, ভিটামিন ‘সি’-এর অন্যতম উৎস হিসেবে লেবুজাতীয় ফসলের চাষ ভোলায় দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। অল্প খরচ ও কম পরিশ্রমে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। সরাসরি কৃষক ও পাইকারদের লেনদেন হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমেছে, ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।
ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া এলাকার সফল উদ্যোক্তা সুজন/কামাল বর্মণের চায়না থ্রি ও সিডলেস এলাচি (কাগজি লেবু) চাষের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার আরও অনেক কৃষক এখন লেবু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।