মোঃ আশরাফুল ইসলাম বেড়া-(পাবনা) প্রতিনিধিঃ সিরাজগঞ্জ জেলার বাঘাবাড়ির গ্রামের খামারি জাকির হোসেন। দুইবছর আগেও তার খামারে শতাধিক গাভী পালন করতেন।তবে বর্তমান তার খামারে শতাধিক পশু লালন পালনের সকল সুযোগ সুবিধা থাকলেও তিনি মাত্র চারটি গাভী পালন করছেন । কারণ হিসেবে তিনি জানান,অব্যাহত লোকসানের মুখে তিনি গাভীগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন।
তার মতো পাবনা সিরাজগঞ্জ জেলার শত শত গো-পালনকারী অভিযোগ তুলছেন খোলা বাজারে এক লিটার দুধ ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে অথচ পক্রিয়াজাতকরণ সরকারি,বে-সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ৪০ থেকে ৪৫ টাকা লিটারের বেশি দাম দিচ্ছে না। ফলে গো-পালনকারী খামারিরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন গো-পালন থেকে।তারা দাবি করছেন অন্তত পক্ষে প্রতিলিটার দুধের দাম ১০ টাকা বৃদ্ধি না করলে দুধ উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে যার প্রভাব পড়বে এলাকার হাজার হাজার পরিবারের জীবন মান উন্নয়নে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় ছোট-বড় চার শ’ বাথানের বিস্তীর্ণ গো-চারণভূমিতে উন্নতজাতের লক্ষাধিক গরু পালন করছে খামারিরা। এসব গরুর আয়ের উপর নির্ভরশীল প্রায় দেড় লাখ পরিবারের জীবন জীবিকা । তাদের উৎপাদিত প্রায় দুই লাখ লিটার খাঁটি তরল দুধ সংগ্রহ করেন সরকারি সমবায় প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা সহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান। মুলত তারাই তাদের বেধে দেয়া মূল্যতে খামারিদের কাছ থেকে দুধ কিনে থাকেন।
খামারিদের অভিযোগ গো-খাদ্যের উচ্চ মূল্যসহ দুধ উৎপাদনের ব্যয়বৃদ্ধিকে তারা বিবেচনায় না নিয়ে খামারিদের সবসময়ের জন্য ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করে যাচ্ছে, যে কারণে দিন দিন গো-পালনের উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে খামারিরা।
চরাচিথুলিয়া গ্রামের খামারি মোঃ টিক্কা খান জানান, সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান খামারিদের কাছ থেকে চার দশমিক শূণ্য স্ট্যান্ডার্ড ননীযুক্ত তরল দুধ বোনাসসহ ৪৩-৪৮ টাকায় কিনে নেন। প্রথমেই সেই দুধ থেকে তাঁরা আংশিক ননী তুলে নেন । পরে তিন দশমিক ৫০ স্ট্যান্ডার্ড ননীযুক্ত তরল দুধ প্যাকেটজাত করে ৮৫ টাকা দরে বাজারজাত করেন । প্রতি লিটার দুধ থেকে শূণ্য দশমিক ৫০ স্ট্যান্ডার্ড ননী তুলে ঘি তৈরি করা হয়। এতে প্রতি লিটার দুধে লাভ হয় ৩৫ টাকা। এছাড়া এক লিটার দুধ থেকে তুলে নেয়া ননী থেকে প্রায় ৪০ গ্রাম ঘি উৎপাদিত হয় যার মূল্য ৫০ টাকা। সব মিলে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি লিটার দুধ থেকে শুধু লাভই করছে ৮৫ টাকা। অন্যদিকে এসকল কোম্পানি গুলো খামারিদেকে তাঁরা দিচ্ছে মাত্র ৪০ থেকে ৪৮ টাকা। এভাবে ক্ষতির মধ্যে পড়ে রয়েছেন খামারিরা।
বেড়া উপজেলা “হাটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়ন মিল্ক ভিটা সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ আলম জানান, আগে তার সমিতির মাধ্যমে দুই শতাধিক খামারি প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার লিটার দুধ সরবরাহ করতো। তবে বর্তমান এ সমিতির কার্যক্রম সম্পুর্ন বন্ধ রয়েছে।কারণ হিসেবে তিনি জানান,খামারিরা খোলাবাজারে দাম বেশি পাওয়াতে সমিতিতে দুধ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন।
স্থানীয় বেসরকারি দুগ্ধ পক্রিয়া জাত কোম্পানী ইছামতি মিল্ক এন্ড ডেইরি (পিউরি ডেইরি মিল্ক) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন,খামারিরা দুধের কম মূল্য পাচ্ছেন কথা সত্য।তবে করোনাকালীন সংকটে ছোট ছোট কোম্পানি বাজার হারিয়ে সংকটের মধ্যে পড়ায় বড় কোম্পানিগুলো একক ভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
বেড়া উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার মিজানুর রহমান বলেন, তিনি খামারিদের বিভিন্ন ভাবে প্রশিক্ষন দিচ্ছেন প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গো-পালনের মাধ্যমে খামারিরা কিভাবে লালন পালন ব্যয় কমিয়ে রাখতে পারেন।
এদিকে অনেক খামারিদের অভিযোগ করেছেন স্বাধীনতার আগে বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর উপজেলা জুড়ে চার শ’ বাথানে প্রায় পাঁচ হাজার একর সরকারি খাস /পরিত্যক্ত গো-চারণভূমি ছিল । যে গুলো সরকার নিয়ন্ত্রিত মিল্ক ভিটা লিজ গ্রহন করে তাদের সমিতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতো। খামারিরা সেই সকল বাথানে উন্মুক্ত ভাবে ঘাস চাষ করে লাভবান হতেন। বিগত বছরগুলোতে সেই সকল বাথান সমিতির অনেক অসাধু প্রভাবশালীরা জাল দলিলের মাধ্যমে নিজ নামে রেকর্ড করিয়ে আবাদি জমি বানিয়ে সেখানে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষ করছেন। ফলে পাঁচ হাজার একরের গোচারণভূমি বেদখল হয়ে দেড় দুই হাজার একরে দাঁড়িয়েছে। গো-পালনে প্রতিবন্দিকতা দুর করতে খামারিরা এ সকল গোচারণভূমি ওই দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করে সেগুলোতে ঘাস চাষের ব্যবস্থার দাবি জানান ।
২২-৫-২৩
ছবিঃ- শাহজাদপুর উপজেলার রাউতারা গ্রামের মিল্ক ভিটা নিয়ন্ত্রিত গো-চারণ ভুমি (বাথান)। এমন অনেক বাথান বেদখল হয়ে আবাদি জমি বানিয়ে ফেলেছে একটি চক্র।