
জয়নাল আবেদীন রাজু। স্টাফ রিপোর্টার বরগুনায় ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট। জেলার ছয় উপজেলায় গড়ে প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ২৩ দশমিক ৫ থেকে ২৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ৩৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। ফলে দিন-রাত ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন, ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। অথচ এমন সংকটের মধ্যেই বরগুনা জেলা শহরের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থাপনায় সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সিভিল সার্জনের কার্যালয়, গণপূর্ত বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পৌরসভা, সার্কিট হাউসসহ বিভিন্ন সরকারি ভবনে রাতের বেলায় অসংখ্য বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ভবনকে রাতভর আলোকসজ্জায় সজ্জিত অবস্থায় দেখা যায়। অফিস কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরও এসব বাতি দীর্ঘ সময় জ্বলে থাকায় বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সরকারি অফিসগুলোতেই যদি প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনা মানতে উৎসাহিত করা কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে শহরের দোকানপাটকে সন্ধ্যার পর ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখতে বলা হলেও সরকারি ভবনে রাতভর বাতি জ্বলতে থাকায় বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে। ….. বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সরকারি নির্দেশনায় অফিস কক্ষ ত্যাগের সময় বাতি, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ করা, করিডোর-সিঁড়ি-ওয়াশরুমে অপ্রয়োজনীয় বাতি বন্ধ রাখা এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বরগুনার সরকারি দপ্তরগুলোর চিত্র যেন সেই নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যারা সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবেন, তারাই যদি সেই নির্দেশনা যথাযথভাবে না মানেন, তাহলে জনগণের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কতটা থাকবে? বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা শহরে প্রায় ৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। সদর পল্লী এলাকায় ৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ মেগাওয়াট। পাথরঘাটায় ১৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৫ মেগাওয়াট, আমতলীতে ১৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৫ মেগাওয়াট, তালতলীতে ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে ২ মেগাওয়াট, বামনায় ৬ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৩ মেগাওয়াট এবং বেতাগীতে ৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ওজোপাডিকোর বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বরগুনা শহরে ৬.৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সাড়ে ৩.৬ মেগাওয়াট সরবরাহ পাওয়ার বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে জেলার মৎস্য খাতেও। পাথরঘাটা ও বরগুনাতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না থাকায় বরফকলগুলো প্রয়োজনীয় বরফ উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। অনেক ট্রলার পর্যাপ্ত বরফ না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছে না বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু চলতি সংকট নয়, গত ৩ আগস্ট বরগুনায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে নাগরিকদের বিক্ষোভ ও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওয়ের ঘটনাও ঘটে। ওই সময় আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছিলেন, জেলার দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৩০ মেগাওয়াট হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে সর্বোচ্চ ১০ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ বিভিন্ন সময় চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে সরকারি দপ্তরগুলোতে রাতভর বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখার বিষয়টি শুধু বিদ্যুৎ অপচয়ের প্রশ্ন নয়; এটি সরকারি অর্থের সাশ্রয় ও প্রশাসনিক জবাবদিহির সঙ্গেও সম্পর্কিত। জাতীয় গ্রিডে যখন বিদ্যুতের ঘাটতি, তখন প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুতের ব্যবহারেই দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তার প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় কিছু আলো অবশ্যই রাখা যেতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তার আলো আর অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা এক বিষয় নয়। কোন বাতি প্রয়োজনীয়, কোনটি বন্ধ রাখা সম্ভব- তা নির্ধারণ করে প্রতিটি সরকারি ভবনে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নজরদারি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি দপ্তরগুলোর প্রধানদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অফিস সময় শেষে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ হয়েছে কি না, রাতের বেলায় কতগুলো বাতি প্রয়োজনীয়ভাবে জ্বলছে এবং কোথায় অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে- তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বরগুনার মানুষের প্রত্যাশা, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি দপ্তরগুলো আগে নিজেদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। কারণ সাধারণ মানুষকে সাশ্রয়ের কথা বলার আগে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের বিদ্যুৎ ব্যবহারেও সাশ্রয় ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চাহিদার তুলনায় যখন প্রায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, তখন একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং আর অন্যদিকে সরকারি ভবনে রাতভর অপ্রয়োজনীয় বাতি জ্বলে থাকা- এই বৈপরীত্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে অপচয় বন্ধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও এখন জোরালো হচ্ছে।
Reporter Name 


















