
মোঃ জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধিঃ
কুষ্টিয়ার মিরপুরে নকল সিগারেট তৈরির অভিযোগে আলোচিত চক্রের মূলহোতা হিসেবে অভিযুক্ত ‘ভারগন টোব্যাকো’র মালিক রাইসুল ইসলাম পবনের একটি গোপন গোডাউনে অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। রোববার (২ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার তালবাড়িয়া ইউনিয়নের পূর্ব গোবিন্দপুর এলাকায় পরিচালিত এ অভিযানে গোডাউনটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়ায় তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তবে অভিযানের পর মাত্র ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেই অভিযান শেষ হওয়ায় শাস্তির যথাযথতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স ও সাইনবোর্ড ছাড়া কারখানা পরিচালনা এবং আইন অমান্য করার অপরাধে ‘ভারগন টোব্যাকো’র মালিক রাইসুল ইসলাম পবনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনিরা আখতারের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।
প্রশাসনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ওই গোডাউনে নামীদামি ব্র্যান্ডের নকল সিগারেট তৈরি ও বাজারজাতের অভিযোগ আসছিল। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অপরাধ দমনের লক্ষ্যে অভিযান চালানো হয়।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগ অনুযায়ী, ‘ভারগন টোব্যাকো’র আড়ালে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে একাধিক গোপন কারখানা ও গোডাউন গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় জনপ্রিয় ব্র্যান্ড—গোল্ডলিফ, বেনসনসহ বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানের আদলে হুবহু নকল সিগারেট তৈরি করে রাতের আঁধারে কাভার্ডভ্যান ও বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তামাক ব্যবসার আড়ালে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অতীতেও একাধিকবার প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেও মূল নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রতিবারই কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ রেখে পরে আবারও একই ব্যবসা শুরু করা হয়।
তবে অভিযানের পর নকল সিগারেট উৎপাদনের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়া হয়নি। অভিযানে কী পরিমাণ নকল সিগারেট, মোড়ক, কাঁচামাল বা উৎপাদন যন্ত্রপাতি জব্দ হয়েছে, সে সম্পর্কেও কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নকল সিগারেট তৈরির অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিষয়টি নিয়ে। স্থানীয়দের মতে, যদি অভিযানে সত্যিই নকল সিগারেট উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে শুধু লাইসেন্স ও সাইনবোর্ড-সংক্রান্ত অনিয়মে জরিমানা করেই বিষয়টি শেষ হওয়া উচিত নয়।
আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্যের নিবন্ধিত ট্রেডমার্ক বা ব্র্যান্ড নকল করে সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করা হলে ট্রেডমার্ক আইন, ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, বিএসটিআই আইন, সংশ্লিষ্ট রাজস্ব আইন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হতে পারে। এসব অপরাধে শুধু জরিমানা নয়, কারাদণ্ড, জব্দ, কারখানা সিলগালা এবং অন্যান্য কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, যদি অভিযানে নকল সিগারেট তৈরির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা হলো না কেন? আর যদি এমন কোনো প্রমাণ না পাওয়া যায়, তবে অভিযানের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হলো না কেন, একই সঙ্গে জব্দকৃত মালামালের তালিকাও প্রকাশ করা হয়নি।
আজকের অভিযানের পর এলাকাবাসীর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও তাদের দাবি, শুধু নামমাত্র জরিমানা নয়, অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় অতীতের মতোই এই চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা তাদের।
Reporter Name 




















