
আজহারুল ইসলাম সাদী, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলা ও জরাজীর্ণতা দশা থেকে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া গ্রামের ঐতিহাসিক শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দিরটি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে মন্দিরটির জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে সংরক্ষণের দাবি তুলে ধরার পর এবার দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়েছে খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। বুধবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে শ্যামসুন্দর মন্দির পরিদর্শন করেন খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গবেষক এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শাপলা সিংহ, সমাজকর্মী ও সাংবাদিক মিলন বিশ্বাস, পরিবেশ সাংবাদিক মো. হোসেন আলী, মিলন বিশ্বাস রুদ্র, মন্দিরের সেবায়েত সুবপ্রসাদ চৌধুরীসহ স্থানীয়রা। পরিদর্শনকালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মন্দিরটির বর্তমান কাঠামোগত অবস্থা, দেয়াল, কার্নিশ, পোড়ামাটির অলংকরণ ও স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। জরাজীর্ণ অংশগুলো পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সংস্কারের আগে কী ধরনের কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা নিয়েও আলোচনা করা হয়। পরিদর্শন শেষে খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মহিদুল ইসলাম বলেন, শ্যামসুন্দর মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি। মন্দিরটির প্রাথমিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ ইতোমধ্যে করা হয়েছে। এখন মূল সংস্কারকাজের আগে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রি-ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করা হবে। তিনি বলেন, “একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রি-ডকুমেন্টেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছাড়া সরাসরি সংস্কারে গেলে স্থাপনার মূল বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষজ্ঞ টিম এসে স্থাপনাটির বিস্তারিত তথ্য, নকশা, কাঠামোগত অবস্থা ও অন্যান্য উপাত্ত সংগ্রহ করবে। এরপর মূল সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।” মন্দিরের স্থাপনার গায়ে জন্ম নেওয়া পুরোনো গাছ ও পরগাছা অপসারণের বিষয়েও সতর্কতার কথা জানান তিনি। তার ভাষ্য, এসব গাছ অত্যন্ত ধীরে ও সতর্কতার সঙ্গে অপসারণ করা হবে, যাতে মূল স্থাপনার কোনো ক্ষতি না হয়। মহিদুল ইসলাম আরও বলেন, “সামনের অর্থবছরে বরাদ্দ নিয়ে মন্দিরটির সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য কাজ করা হবে। মন্দিরের এই ভঙ্গুর দশা আর থাকবে না।” ডিজিটাল আর্কাইভের প্রস্তাব পরিদর্শনের সময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গবেষক এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শাপলা সিংহ মন্দিরটির স্থাপত্য সংরক্ষণের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, শুধু ভবনের পুরোনো নকশা ফিরিয়ে আনলেই হবে না; মন্দিরটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক ইতিহাসও সংরক্ষণ করতে হবে। উপকূলীয় নোনা পরিবেশ ও আর্দ্রতার কারণে স্থাপনাটির ক্ষয় হচ্ছে। তাই ৬০ বছরের বেশি বয়সী স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে মন্দিরটির ইতিহাস ও মৌখিক স্মৃতি সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরির প্রস্তাব দেন। দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীদের জন্য মন্দিরটির ইতিহাস ও অতীতের পরিবেশ তুলে ধরতে আলোকচিত্র, তথ্যচিত্র ও ডিজিটাল উপস্থাপনার ব্যবস্থার কথাও বলেন তিনি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পরিদর্শন এবং দ্রুত সংস্কারের আশ্বাসে স্থানীয় বাসিন্দা, পূজারী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আশার আলো দেখা দিয়েছে। মন্দিরের সেবারত সুপ্রসাদ চৌধুরী বলেন, “প্রাথমিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হওয়ায় আমরা আশাবাদী। তবে আমাদের দাবি, পুরো মন্দির প্রাঙ্গণটি সীমানাপ্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত করা হোক। অরক্ষিত পরিবেশের সুযোগ নিয়ে এখানে মাদকসেবী ও বখাটেদের আড্ডা বসে। প্রতিবাদ করলে হুমকির মুখে পড়তে হয়। সংস্কারের পাশাপাশি মন্দিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।” স্থানীয় ইতিহাস ও বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্যামসুন্দর মঠ-মন্দিরটি কয়েক শত বছরের পুরোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তথ্য মতে জানা যায় ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাশ—মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাশ—মন্দিরটি নির্মাণ করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। আরো জানা যায় প্রথমত একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি উপাসনালয়ের জন্য এটি নির্মাণ করলেও তিনি দেশ ত্যাগ করে আর এখানে ফিরে না আসায় দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে অযত্নে অবহেলায়। এর পর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপযোগী উপসানলয় হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করা হয়। তার পর অযত্ন ও অবহেলিত অবস্থায় বর্তমানে জীর্ণ শীর্ণ অবস্থায় আছে এই প্রাচীন ঐতিহ্যের মন্দিরটি বর্তমানে এটি মঠবাড়ি মন্দির নামে পরিচিত। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু তিনতলা ভবন বিশিষ্ট নবরত্ন স্থাপত্যের মূল মন্দিরটির সঙ্গে রয়েছে দুর্গা মন্দির ও শিব (অন্নপূর্ণা) মন্দির। সামনে রয়েছে ‘জমির বিশ্বাসের পুকুর’ নামে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক দীঘি। মন্দিরের দেয়াল ও কার্নিশে পোড়ামাটির অলংকরণ, ফুল-লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা ও ধর্মীয় কাহিনিনির্ভর শিল্পকর্ম রয়েছে। স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় এখানে স্বর্ণের রাধা-কৃষ্ণের মূর্তি ও কষ্টিপাথরের ১২টি শিবলিঙ্গ ছিল। পরবর্তী সময়ে সেগুলো চুরি হয়ে যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের কর্মকর্তা, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা মন্দিরটি পরিদর্শন করে সংরক্ষণের আশ্বাস দিলেও বড় ধরনের সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। এবার প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সরেজমিন পরিদর্শন, প্রি-ডকুমেন্টেশনের উদ্যোগ এবং আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ নিয়ে সংস্কারের ঘোষণা ঘিরে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এবার আর আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবায়ন হবে সংস্কার ও সংরক্ষণকাজ। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, সাতক্ষীরা জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
Reporter Name 


















