ঢাকা ০৩:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসক নেই, ওষুধ নেই—সুন্দরগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে জনবল সংকটে ১৫ ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা, বঞ্চিত লাখো মানুষ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:০৪:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২৫ Time View
Print

মোঃ আতাউর রহমান মুকুল, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় জনবল ও ওষুধ সংকটে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। উপজেলার ১৫ ইউনিয়নে থাকা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধের সংকট থাকায় গর্ভবতী মা, শিশু-কিশোর-কিশোরী, সক্ষম দম্পতিসহ সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে রয়েছে ৮টি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্র। অপর ৭টি কেন্দ্র স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট, ওষুধের অপ্রতুলতা ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এসব কেন্দ্রে নিয়মিত সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ১৫টি হেলথ ভিজিটর পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৬ জন। ফলে তাদের রোটেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফার্মাসিস্টের ৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন। এছাড়া সহকারী মেডিকেল অফিসারের ৬টি পদই শূন্য রয়েছে। মেডিকেল অফিসারের দুটি পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অন্যদিকে, ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্টের ৯৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৫৬ জন। প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রসবকালীন সেবা, শিশুস্বাস্থ্য ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও নিয়মিতভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরেজমিনে উপজেলার সোনারায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্র পরিদর্শনকালে সেবা গ্রহীতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় ওষুধ এবং স্বাস্থ্যকর্মী না পাওয়ায় অনেকেই এসব কেন্দ্রে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। সোনারায় এলাকার ফরিদা বেগম নামে এক সক্ষম দম্পতি বলেন, “কেন্দ্রে গিয়ে কী লাভ? ওষুধ পাওয়া যায় না, আবার ভিজিটরকেও অনেক সময় পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে ক্লিনিকে গিয়ে টাকা খরচ করে চেকআপ ও ওষুধ কিনতে হয়।” ধোপাডাঙ্গা এলাকার সক্ষম দম্পতি আনোয়ারা বেগম বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রায় বন্ধের মতো। প্রয়োজনীয় সেবা না পাওয়ায় সাধারণ মানুষকে বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ভিজিটর নাজমুন্নাহার জানান, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এসব কেন্দ্রে ওষুধ ও জনবল সংকট রয়েছে। ফলে সক্ষম দম্পতিদের পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ রোগীর চিকিৎসা, গর্ভবতী মায়ের চেকআপ, ডেলিভারি সেবা এবং ০ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়মিতভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সক্ষম দম্পতি রয়েছেন। পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় এ বিশাল জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। পাশাপাশি শিশু-কিশোর-কিশোরী ও সাধারণ মানুষও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বাদল কুমার বর্মণ বলেন, “জনবল ও ওষুধের অভাবে আমরা যথাযথভাবে সেবা দিতে পারছি না। উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সক্ষম দম্পতি রয়েছেন। এছাড়া শিশু-কিশোর-কিশোরী ও সাধারণ মানুষও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করা জরুরি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে এসব কেন্দ্রের জনবল সংকট দ্রুত দূর করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা আরও সংকটে পড়বে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভা ও অপরাধ সভা অনুষ্ঠিত”

চিকিৎসক নেই, ওষুধ নেই—সুন্দরগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে জনবল সংকটে ১৫ ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা, বঞ্চিত লাখো মানুষ

Update Time : ০১:০৪:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Print

মোঃ আতাউর রহমান মুকুল, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় জনবল ও ওষুধ সংকটে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। উপজেলার ১৫ ইউনিয়নে থাকা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধের সংকট থাকায় গর্ভবতী মা, শিশু-কিশোর-কিশোরী, সক্ষম দম্পতিসহ সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে রয়েছে ৮টি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্র। অপর ৭টি কেন্দ্র স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট, ওষুধের অপ্রতুলতা ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে এসব কেন্দ্রে নিয়মিত সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ১৫টি হেলথ ভিজিটর পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৬ জন। ফলে তাদের রোটেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফার্মাসিস্টের ৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র একজন। এছাড়া সহকারী মেডিকেল অফিসারের ৬টি পদই শূন্য রয়েছে। মেডিকেল অফিসারের দুটি পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অন্যদিকে, ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্টের ৯৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৫৬ জন। প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রসবকালীন সেবা, শিশুস্বাস্থ্য ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও নিয়মিতভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরেজমিনে উপজেলার সোনারায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্র পরিদর্শনকালে সেবা গ্রহীতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় ওষুধ এবং স্বাস্থ্যকর্মী না পাওয়ায় অনেকেই এসব কেন্দ্রে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। সোনারায় এলাকার ফরিদা বেগম নামে এক সক্ষম দম্পতি বলেন, “কেন্দ্রে গিয়ে কী লাভ? ওষুধ পাওয়া যায় না, আবার ভিজিটরকেও অনেক সময় পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে ক্লিনিকে গিয়ে টাকা খরচ করে চেকআপ ও ওষুধ কিনতে হয়।” ধোপাডাঙ্গা এলাকার সক্ষম দম্পতি আনোয়ারা বেগম বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রায় বন্ধের মতো। প্রয়োজনীয় সেবা না পাওয়ায় সাধারণ মানুষকে বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ভিজিটর নাজমুন্নাহার জানান, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এসব কেন্দ্রে ওষুধ ও জনবল সংকট রয়েছে। ফলে সক্ষম দম্পতিদের পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ রোগীর চিকিৎসা, গর্ভবতী মায়ের চেকআপ, ডেলিভারি সেবা এবং ০ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়মিতভাবে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সক্ষম দম্পতি রয়েছেন। পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় এ বিশাল জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। পাশাপাশি শিশু-কিশোর-কিশোরী ও সাধারণ মানুষও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বাদল কুমার বর্মণ বলেন, “জনবল ও ওষুধের অভাবে আমরা যথাযথভাবে সেবা দিতে পারছি না। উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সক্ষম দম্পতি রয়েছেন। এছাড়া শিশু-কিশোর-কিশোরী ও সাধারণ মানুষও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করা জরুরি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে এসব কেন্দ্রের জনবল সংকট দ্রুত দূর করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা আরও সংকটে পড়বে।