ঢাকা ০২:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

  • Reporter Name
  • Update Time : ১২:১৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
  • ১৭ Time View
Print

নিজস্ব প্রতিবেদক |
বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গ্রামের মেঠোপথে, শতবর্ষী নদীর তীরে, পরিত্যক্ত রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষে, প্রাচীন মসজিদ-মন্দিরে এবং মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা লোককথায়। সেই বিস্মৃত ইতিহাসের সন্ধানেই বছরের পর বছর ক্যামেরা কাঁধে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলেছেন চুয়াডাঙ্গার তরুণ সাংবাদিক ও ডকুমেন্টারি নির্মাতা আরিফ হাসান।
চুয়াডাঙ্গা জেলার হিজলগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা আরিফ হাসান। পিতা মুনসুর আলী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থানীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতা করে আসছেন। তবে পেশার গণ্ডি ছাড়িয়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নদীকেন্দ্রিক গবেষণাভিত্তিক ভিডিও নির্মাতা হিসেবে।
অনেকেই ভ্রমণে যান প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে। কিন্তু আরিফ হাসানের ভ্রমণের উদ্দেশ্য ভিন্ন। তিনি খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য, প্রাচীন স্থাপনা, জনপদের অজানা কাহিনি এবং নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা সভ্যতার গল্প। তার বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার প্রতিটি নদী, প্রতিটি গ্রাম এবং প্রতিটি পুরোনো স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য ইতিহাস, যা এখনো মানুষের কাছে অজানা।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি গড়ে তুলেছেন ‘চুয়াডাঙ্গা পরিবার’ নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। শুরুতে স্থানীয় বিষয় নিয়ে কাজ করলেও ধীরে ধীরে তার কনটেন্টের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক ভিডিওগুলো মিলিয়ে দর্শকসংখ্যা কোটির ঘর অতিক্রম করেছে। দেশের নানা প্রান্তের মানুষ নিয়মিত তার ভিডিও দেখে ইতিহাস জানছেন, মতামত দিচ্ছেন এবং নতুন নতুন স্থান সম্পর্কে তথ্য জানাচ্ছেন।
ভিডিও নির্মাণকে তিনি শুধুই কনটেন্ট তৈরির কাজ হিসেবে দেখেন না। প্রতিটি ভিডিওর আগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, প্রবীণদের স্মৃতিচারণ সংগ্রহ, বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র যাচাই এবং সরেজমিনে অনুসন্ধান—এসবই তার কাজের অপরিহার্য অংশ। ফলে তার ভিডিওতে শুধু দৃশ্য নয়, ইতিহাস ও তথ্যের সমন্বয়ও থাকে।
ইতোমধ্যে তিনি চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, রাজবাড়ি, দরবার, নদী, প্রত্ননিদর্শন ও লোকঐতিহ্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন। তার নির্মিত ভিডিওগুলোর মাধ্যমে অনেক কম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থান নতুন করে মানুষের নজরে এসেছে।
সহকর্মীদের মতে, স্থানীয় সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তার অনুসন্ধানী মনোভাবকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। সংবাদ সংগ্রহের দক্ষতা তিনি কাজে লাগান ইতিহাস অনুসন্ধানেও। কোনো তথ্য নিশ্চিত না হয়ে তিনি তা প্রকাশ করেন না। এই সতর্কতাই তার কাজকে দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
আরিফ হাসান বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমি চাই, সেগুলো অন্তত ভিডিওর মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকুক, যাতে আগামী প্রজন্ম নিজেদের শেকড় সম্পর্কে জানতে পারে।”
তিনি জানান, তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য দেশের সব ৬৪ জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, নদী ও মানুষের গল্প গবেষণাভিত্তিকভাবে তুলে ধরা। শুধু দেশেই নয়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতেও গিয়ে ডকুমেন্টারি নির্মাণ করতে চান।
ডিজিটাল যুগে দ্রুত জনপ্রিয়তার জন্য যখন অনেকেই স্বল্পস্থায়ী বিনোদননির্ভর কনটেন্টে ঝুঁকছেন, তখন আরিফ হাসান বেছে নিয়েছেন গবেষণা, তথ্য এবং ইতিহাসনির্ভর একটি ভিন্ন পথ। হয়তো সেই কারণেই তার দর্শকসংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, আর বাড়ছে ইতিহাস জানতে আগ্রহী মানুষের একটি সম্প্রদায়।
চুয়াডাঙ্গার একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বড় স্বপ্ন দেখছে। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় খুঁজে বের করে আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার যে প্রত্যয় নিয়ে আরিফ হাসান পথ চলছেন, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ডিজিটাল ইতিহাসচর্চায় একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি 🕊️ হিউম্যান এইড ইন্টারন্যাশনাল ও বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব-এর পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করছি আজকের এই শোকাবহ দিনটি।

Update Time : ১২:১৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
Print

নিজস্ব প্রতিবেদক |
বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গ্রামের মেঠোপথে, শতবর্ষী নদীর তীরে, পরিত্যক্ত রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষে, প্রাচীন মসজিদ-মন্দিরে এবং মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা লোককথায়। সেই বিস্মৃত ইতিহাসের সন্ধানেই বছরের পর বছর ক্যামেরা কাঁধে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলেছেন চুয়াডাঙ্গার তরুণ সাংবাদিক ও ডকুমেন্টারি নির্মাতা আরিফ হাসান।
চুয়াডাঙ্গা জেলার হিজলগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা আরিফ হাসান। পিতা মুনসুর আলী। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থানীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতা করে আসছেন। তবে পেশার গণ্ডি ছাড়িয়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নদীকেন্দ্রিক গবেষণাভিত্তিক ভিডিও নির্মাতা হিসেবে।
অনেকেই ভ্রমণে যান প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে। কিন্তু আরিফ হাসানের ভ্রমণের উদ্দেশ্য ভিন্ন। তিনি খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য, প্রাচীন স্থাপনা, জনপদের অজানা কাহিনি এবং নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা সভ্যতার গল্প। তার বিশ্বাস, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার প্রতিটি নদী, প্রতিটি গ্রাম এবং প্রতিটি পুরোনো স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য ইতিহাস, যা এখনো মানুষের কাছে অজানা।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি গড়ে তুলেছেন ‘চুয়াডাঙ্গা পরিবার’ নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। শুরুতে স্থানীয় বিষয় নিয়ে কাজ করলেও ধীরে ধীরে তার কনটেন্টের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক ভিডিওগুলো মিলিয়ে দর্শকসংখ্যা কোটির ঘর অতিক্রম করেছে। দেশের নানা প্রান্তের মানুষ নিয়মিত তার ভিডিও দেখে ইতিহাস জানছেন, মতামত দিচ্ছেন এবং নতুন নতুন স্থান সম্পর্কে তথ্য জানাচ্ছেন।
ভিডিও নির্মাণকে তিনি শুধুই কনটেন্ট তৈরির কাজ হিসেবে দেখেন না। প্রতিটি ভিডিওর আগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, প্রবীণদের স্মৃতিচারণ সংগ্রহ, বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র যাচাই এবং সরেজমিনে অনুসন্ধান—এসবই তার কাজের অপরিহার্য অংশ। ফলে তার ভিডিওতে শুধু দৃশ্য নয়, ইতিহাস ও তথ্যের সমন্বয়ও থাকে।
ইতোমধ্যে তিনি চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, নাটোর, পাবনা, বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, রাজবাড়ি, দরবার, নদী, প্রত্ননিদর্শন ও লোকঐতিহ্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন। তার নির্মিত ভিডিওগুলোর মাধ্যমে অনেক কম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থান নতুন করে মানুষের নজরে এসেছে।
সহকর্মীদের মতে, স্থানীয় সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তার অনুসন্ধানী মনোভাবকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। সংবাদ সংগ্রহের দক্ষতা তিনি কাজে লাগান ইতিহাস অনুসন্ধানেও। কোনো তথ্য নিশ্চিত না হয়ে তিনি তা প্রকাশ করেন না। এই সতর্কতাই তার কাজকে দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।
আরিফ হাসান বলেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমি চাই, সেগুলো অন্তত ভিডিওর মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকুক, যাতে আগামী প্রজন্ম নিজেদের শেকড় সম্পর্কে জানতে পারে।”
তিনি জানান, তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য দেশের সব ৬৪ জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, নদী ও মানুষের গল্প গবেষণাভিত্তিকভাবে তুলে ধরা। শুধু দেশেই নয়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতেও গিয়ে ডকুমেন্টারি নির্মাণ করতে চান।
ডিজিটাল যুগে দ্রুত জনপ্রিয়তার জন্য যখন অনেকেই স্বল্পস্থায়ী বিনোদননির্ভর কনটেন্টে ঝুঁকছেন, তখন আরিফ হাসান বেছে নিয়েছেন গবেষণা, তথ্য এবং ইতিহাসনির্ভর একটি ভিন্ন পথ। হয়তো সেই কারণেই তার দর্শকসংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, আর বাড়ছে ইতিহাস জানতে আগ্রহী মানুষের একটি সম্প্রদায়।
চুয়াডাঙ্গার একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বড় স্বপ্ন দেখছে। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় খুঁজে বের করে আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করার যে প্রত্যয় নিয়ে আরিফ হাসান পথ চলছেন, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ডিজিটাল ইতিহাসচর্চায় একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।