
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু লোডশেডিং বা গ্যাসের স্বল্পতা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, এলএনজিনির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, দুর্বল অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ও কারিগরি সমস্যার পর জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ৬ আগস্ট আংশিক সরবরাহ শুরু হলেও ১৯ আগস্ট এলএনজি মজুত শেষ হয়ে আবার সরবরাহ বন্ধ হয়। ২২ আগস্ট নতুন কার্গো আসার পর পুনরায় সরবরাহ শুরু হয়। ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—একটি টার্মিনাল অচল হলে জাতীয় গ্যাসব্যবস্থায় এত বড় সংকট তৈরি হয় কেন? বাংলাদেশে দুটি FSRU-এর সম্মিলিত পুনঃগ্যাসীকরণ সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে প্রায় ১,৬২৭ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে, যেখানে জাতীয় চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার বড় ব্যবধানের মধ্যে একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়া সংকটকে আরও তীব্র করে। ১৮ আগস্ট গ্যাসের সরবরাহ ছিল প্রায় ২,৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট, বিপরীতে চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও শিল্পাঞ্চলে নিম্নচাপের কারণে অনেক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। অর্থাৎ সংকট শুধু সরবরাহের নয়, গ্যাস বণ্টন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণেরও। এলএনজি বাংলাদেশকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। কাতার থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিকল্প উৎস ও স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, বিভিন্ন সরবরাহকারী ও প্রয়োজনমতো স্পট মার্কেট ব্যবহারের সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গতি বাড়ানো জরুরি। নতুন কূপ খনন, সম্ভাবনাময় ব্লকে অনুসন্ধান এবং পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি দক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আরও প্রয়োজন FSRU, পাইপলাইন ও গ্যাস বিতরণব্যবস্থায় স্থিতিস্থাপকতা। একটি টার্মিনাল বা একটি সরবরাহকারী সমস্যায় পড়লেই যাতে জাতীয় অর্থনীতি বিপর্যস্ত না হয়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা ও জরুরি পরিকল্পনা থাকতে হবে। জ্বালানি খাতে বড় প্রকল্প ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ ছাড়া দায়ী না করে স্বাধীন তদন্ত, নিরীক্ষা ও প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, তথ্যভিত্তিক ও ধারাবাহিক জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা। কারণ একটি সরকারের মেয়াদ কয়েক বছর হলেও গ্যাসক্ষেত্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও জাতীয় গ্রিডের পরিকল্পনা চলে কয়েক দশক ধরে। শেষ কথা বর্তমান সংকট শুধু জ্বালানি ঘাটতির সংকেত নয়; এটি আমাদের ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতিরও পরীক্ষা। একটি এলএনজি কার্গো এলে বা একটি টার্মিনাল চালু হলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হবে তখনই, যখন কোনো একটি টার্মিনালের দুর্ঘটনা, কার্গো বিলম্ব বা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারবে না। তাই এখন প্রশ্ন শুধু—বিদ্যুৎ কেন গেল, গ্যাস কেন কম? প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে সংকট এলেও দেশ থেমে যাবে না?
Reporter Name 


















