ঢাকা ০২:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্পার সাইনবোর্ডের আড়ালে ভিন্ন ব্যবসার অভিযোগ গুলশানে শাহ আলম-রাজুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, তদন্তের দাবি

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:০৬:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
  • ৭ Time View
Print

সুমন খান: রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান। বিলাসবহুল ভবন, নামিদামি প্রতিষ্ঠান ও কঠোর নিরাপত্তার আড়ালে থাকা কিছু স্পা সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। বৈধ স্পা, বিউটি পার্লার কিংবা ম্যাসাজ সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সংশ্লিষ্টতা, তরুণীদের শোষণ এবং গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অভিযোগের কথাও স্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে। অনুসন্ধানে গুলশান-১ এলাকায় এমন একটি স্পা সেন্টারের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে শাহ আলম ও রাজু ওরফে ‘টুনটু রাজু’র নাম স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে তরুণীদের চাকরির প্রলোভনে এনে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর জন্য চাপ প্রয়োগ, মাদক সেবন বা সরবরাহের সুযোগ তৈরি এবং গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে গ্রাহকদের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মতো অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদকের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর আইনগত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন। দরজার বাইরে নীরবতা, ভেতরে রহস্য স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুলশান-১ এলাকায় রবি টাওয়ারের পাশের একটি ভবনে কথিত ওই স্পা সেন্টারটির অবস্থান। লিফটে পঞ্চম তলায় নেমে সিঁড়ি দিয়ে এক ধাপ নিচে গেলে প্রতিষ্ঠানটির প্রবেশপথ দেখা যায় বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রবেশপথে কেঁচি গেট ও কাঠের দরজা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রবেশপথের সিসিটিভির মাধ্যমে আগত ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং পরিচিত বা নিশ্চিত গ্রাহক ছাড়া অন্যদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে—একটি সাধারণ স্পা বা ম্যাসাজ সেন্টারের প্রবেশপথে এতটা গোপনীয়তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কেন? তরুণীদের নিয়ে গুরুতর অভিযোগ স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণীদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে আনা হয়। পরবর্তীতে তাদের কথিত ম্যাসাজ সার্ভিসের পাশাপাশি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আর্থিক প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে কিছু তরুণীকে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানো, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগের ভয় দেখানো হয় বলেও তারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে কোনো ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ, মামলা বা প্রামাণ্য নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, নজরদারি কোথায়? প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও সরবরাহের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—কোনো স্পা সেন্টারে যদি নিয়মিত মাদক সেবন বা সরবরাহের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কোথায়? গুলশান-বনানী এলাকায় বিভিন্ন স্পা ও ম্যাসাজ সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে সময়ে সময়ে অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার ধরন এবং কার্যক্রম নিয়মিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। গোপন ক্যামেরায় গ্রাহকদের ভিডিও ধারণের অভিযোগ অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণের অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কক্ষে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করা হতে পারে। পরবর্তীতে এসব ভিডিও ব্যবহার করে বিত্তশালী গ্রাহকদের ব্ল্যাকমেইল বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও সাইবার অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ব্যবস্থা, ডিজিটাল ডিভাইস ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত আইনানুগভাবে পরীক্ষা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। ‘সব ম্যানেজ’—কারা সেই প্রভাবশালী মহল? স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন এবং ‘সবকিছু ম্যানেজ’ করেই ব্যবসা পরিচালনার কথা বলেন। তবে এসব দাবিরও কোনো স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। প্রশ্ন হলো—প্রভাবশালী কোনো মহলের সঙ্গে সত্যিই তাদের যোগাযোগ রয়েছে, নাকি নিজেদের প্রভাব দেখাতে পুলিশ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে? তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারও নাম বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হলে সেটিও আইনগতভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। ট্রেড লাইসেন্সের আড়ালে ভিন্ন ব্যবসা? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—প্রতিষ্ঠানটির বৈধ ব্যবসায়িক অনুমোদন কী এবং বাস্তবে সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে? কোনো প্রতিষ্ঠান যে ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করেছে, বাস্তবে তার বাইরে অন্য কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই কথিত স্পা সেন্টটির ট্রেড লাইসেন্সের ধরন, অনুমোদিত ব্যবসা, ভবন ব্যবহারের অনুমতি এবং বাস্তব কার্যক্রম—সবকিছু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগ তথ্য সংগ্রহের জন্য গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিষ্ঠানটির সামনে গেলে কর্মীদের পক্ষ থেকে অসহযোগিতা ও অসদাচরণের অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসহযোগিতা করা হয়। তবে সাংবাদিকদেরও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইন ও পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। স্থানীয়দের প্রশ্ন—অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই কেন? স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ শোনা গেলেও কার্যকর কোনো অভিযান বা তদন্ত তাদের নজরে আসেনি। তাদের মতে, গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাদক, মানবপাচার, অনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত তদন্ত করা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অসত্যতাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সমন্বিত তদন্তের দাবি স্থানীয়দের দাবি, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—গুলশান ও বনানী এলাকার সব স্পা ও ম্যাসাজ সেন্টারের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে যাচাই করা হোক। তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে— প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসার ধরন; ভবন ব্যবহারের অনুমোদন; কর্মরত ব্যক্তিদের বয়স ও নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য; মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ; সিসিটিভি ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার; গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি; ব্ল্যাকমেইল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ; এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কি না। শাহ আলম-রাজুর বক্তব্য কী? প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে স্পা মালিক হিসেবে উল্লেখিত শাহ আলম এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রাজু ওরফে ‘টুনটু রাজু’র বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গুলশান থানা পুলিশ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বক্তব্যও প্রয়োজন। তাদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফল পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। শেষ প্রশ্ন থেকেই যায় গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় কোনো স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে যদি একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন থাকবেই—এটি কি সত্যিই একটি সাধারণ স্পা সেন্টার, নাকি বৈধ ব্যবসার সাইনবোর্ডের আড়ালে অন্য কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে? অন্যদিকে, যদি অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি না থাকে, তাহলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জনসম্মুখে আসা প্রয়োজন। কারণ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে যদি সত্যিই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী বা ব্যক্তির দায় নয়—নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব মিরপুর কার্যালয় সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ ও সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের দাবিতে মিরপুরে জরুরি সভা

স্পার সাইনবোর্ডের আড়ালে ভিন্ন ব্যবসার অভিযোগ গুলশানে শাহ আলম-রাজুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, তদন্তের দাবি

Update Time : ০১:০৬:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
Print

সুমন খান: রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান। বিলাসবহুল ভবন, নামিদামি প্রতিষ্ঠান ও কঠোর নিরাপত্তার আড়ালে থাকা কিছু স্পা সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। বৈধ স্পা, বিউটি পার্লার কিংবা ম্যাসাজ সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, মাদক সংশ্লিষ্টতা, তরুণীদের শোষণ এবং গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অভিযোগের কথাও স্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা যাচ্ছে। অনুসন্ধানে গুলশান-১ এলাকায় এমন একটি স্পা সেন্টারের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে শাহ আলম ও রাজু ওরফে ‘টুনটু রাজু’র নাম স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে তরুণীদের চাকরির প্রলোভনে এনে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর জন্য চাপ প্রয়োগ, মাদক সেবন বা সরবরাহের সুযোগ তৈরি এবং গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে গ্রাহকদের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের মতো অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এই প্রতিবেদকের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর আইনগত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন। দরজার বাইরে নীরবতা, ভেতরে রহস্য স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুলশান-১ এলাকায় রবি টাওয়ারের পাশের একটি ভবনে কথিত ওই স্পা সেন্টারটির অবস্থান। লিফটে পঞ্চম তলায় নেমে সিঁড়ি দিয়ে এক ধাপ নিচে গেলে প্রতিষ্ঠানটির প্রবেশপথ দেখা যায় বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রবেশপথে কেঁচি গেট ও কাঠের দরজা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রবেশপথের সিসিটিভির মাধ্যমে আগত ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং পরিচিত বা নিশ্চিত গ্রাহক ছাড়া অন্যদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে—একটি সাধারণ স্পা বা ম্যাসাজ সেন্টারের প্রবেশপথে এতটা গোপনীয়তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন কেন? তরুণীদের নিয়ে গুরুতর অভিযোগ স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণীদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে আনা হয়। পরবর্তীতে তাদের কথিত ম্যাসাজ সার্ভিসের পাশাপাশি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আর্থিক প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে কিছু তরুণীকে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানো, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগের ভয় দেখানো হয় বলেও তারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের সমর্থনে কোনো ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ, মামলা বা প্রামাণ্য নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, নজরদারি কোথায়? প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও সরবরাহের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—কোনো স্পা সেন্টারে যদি নিয়মিত মাদক সেবন বা সরবরাহের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কোথায়? গুলশান-বনানী এলাকায় বিভিন্ন স্পা ও ম্যাসাজ সেন্টারের কার্যক্রম নিয়ে সময়ে সময়ে অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে অভিযোগ ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার ধরন এবং কার্যক্রম নিয়মিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। গোপন ক্যামেরায় গ্রাহকদের ভিডিও ধারণের অভিযোগ অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণের অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কক্ষে গোপন ক্যামেরা স্থাপন করে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করা হতে পারে। পরবর্তীতে এসব ভিডিও ব্যবহার করে বিত্তশালী গ্রাহকদের ব্ল্যাকমেইল বা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও সাইবার অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ব্যবস্থা, ডিজিটাল ডিভাইস ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত আইনানুগভাবে পরীক্ষা করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। ‘সব ম্যানেজ’—কারা সেই প্রভাবশালী মহল? স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন এবং ‘সবকিছু ম্যানেজ’ করেই ব্যবসা পরিচালনার কথা বলেন। তবে এসব দাবিরও কোনো স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। প্রশ্ন হলো—প্রভাবশালী কোনো মহলের সঙ্গে সত্যিই তাদের যোগাযোগ রয়েছে, নাকি নিজেদের প্রভাব দেখাতে পুলিশ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে? তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারও নাম বেআইনিভাবে ব্যবহার করা হলে সেটিও আইনগতভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। ট্রেড লাইসেন্সের আড়ালে ভিন্ন ব্যবসা? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—প্রতিষ্ঠানটির বৈধ ব্যবসায়িক অনুমোদন কী এবং বাস্তবে সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে? কোনো প্রতিষ্ঠান যে ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করেছে, বাস্তবে তার বাইরে অন্য কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই কথিত স্পা সেন্টটির ট্রেড লাইসেন্সের ধরন, অনুমোদিত ব্যবসা, ভবন ব্যবহারের অনুমতি এবং বাস্তব কার্যক্রম—সবকিছু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগ তথ্য সংগ্রহের জন্য গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিষ্ঠানটির সামনে গেলে কর্মীদের পক্ষ থেকে অসহযোগিতা ও অসদাচরণের অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসহযোগিতা করা হয়। তবে সাংবাদিকদেরও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইন ও পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। স্থানীয়দের প্রশ্ন—অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই কেন? স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ শোনা গেলেও কার্যকর কোনো অভিযান বা তদন্ত তাদের নজরে আসেনি। তাদের মতে, গুলশানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাদক, মানবপাচার, অনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা ব্ল্যাকমেইলের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত তদন্ত করা উচিত। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অসত্যতাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সমন্বিত তদন্তের দাবি স্থানীয়দের দাবি, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—গুলশান ও বনানী এলাকার সব স্পা ও ম্যাসাজ সেন্টারের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে যাচাই করা হোক। তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে— প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসার ধরন; ভবন ব্যবহারের অনুমোদন; কর্মরত ব্যক্তিদের বয়স ও নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য; মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ; সিসিটিভি ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার; গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি; ব্ল্যাকমেইল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ; এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে কি না। শাহ আলম-রাজুর বক্তব্য কী? প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে স্পা মালিক হিসেবে উল্লেখিত শাহ আলম এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত রাজু ওরফে ‘টুনটু রাজু’র বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে গুলশান থানা পুলিশ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বক্তব্যও প্রয়োজন। তাদের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফল পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। শেষ প্রশ্ন থেকেই যায় গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় কোনো স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে যদি একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রশ্ন থাকবেই—এটি কি সত্যিই একটি সাধারণ স্পা সেন্টার, নাকি বৈধ ব্যবসার সাইনবোর্ডের আড়ালে অন্য কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে? অন্যদিকে, যদি অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি না থাকে, তাহলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জনসম্মুখে আসা প্রয়োজন। কারণ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে যদি সত্যিই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী বা ব্যক্তির দায় নয়—নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে