
মো. পারভেজ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি :–
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে দায়িত্বরত অবস্থায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১৭ জুলাই) রাত প্রায় ৯টার দিকে কালীগঞ্জ থানার সামনে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, হামলার সময় কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন সঙ্গীয় পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তবে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা।
হামলায় আহত দুই সাংবাদিক হলেন দীপ্ত টিভির ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি ও দৈনিক যুগান্তরের কালীগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি শাহরিয়ার আলম সোহাগ এবং নাগরিক টিভির ঝিনাইদহ জেলা প্রতিনিধি মিশন আলী। আহত অবস্থায় তাদের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
আহত সাংবাদিক মিশন আলী জানান, গত ১১ জুলাই শহরের আড়পাড়া এলাকায় মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মিলন হোসেন নামে এক যুবককে কয়েকজন ব্যক্তি মারধর করেন। ওই ঘটনার ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে পুলিশ আড়পাড়া এলাকার মিঠু নামে এক যুবককে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে এলাকাবাসী বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে থানায় আসেন।
তিনি অভিযোগ করেন, এ সময় ওসি জেল্লাল হোসেন জালাল ও শাহীন লস্করকে ফোন করে থানায় ডেকে আনেন। বিষয়টি জানতে পেরে রাত ৯টার দিকে তিনি ও সাংবাদিক শাহরিয়ার আলম সোহাগ সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে থানার সামনে যান। সেখানে কয়েকজন নারীকে ধাক্কাধাক্কি ও হামলার শিকার হতে দেখেন। সেই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করতে গেলে উপজেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জালাল ভিডিও ধারণে বাধা দেন এবং বিএনপির কোনো ভিডিও করা যাবে না বলে হুমকি দেন। একপর্যায়ে জালাল তার ওপর হামলা চালান। পরে কমলাপুর গ্রামের হাসান, নদীপাড়ার টিটো এবং ফারাসপুর গ্রামের রবিউলসহ আরও কয়েকজন তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অপর আহত সাংবাদিক শাহরিয়ার আলম সোহাগ বলেন, আড়পাড়া এলাকা থেকে ১৬ থেকে ২০ জন নারী মামলা গ্রহণ না করার অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেন। এ সময় উপজেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জালালসহ কয়েকজন তাদের ওপর হামলা চালান। সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপরও হামলা করা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলার পুরো ঘটনাটি ওসির সামনেই ঘটলেও তিনি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেননি। বরং অভিযুক্ত জালালকে নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগের সুযোগ করে দেওয়া হয়। তার দাবি, ওসির বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত অনিয়ম ও আসামির মোবাইল ফোন গায়েব হওয়ার অভিযোগ নিয়ে দৈনিক যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে এ হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় আড়পাড়া এলাকার মিঠু নামে একটি নিয়মিত মামলার আসামিকে আটক করা হয়। পরে রাত ৮টার দিকে তার পরিবারের সদস্যরা এলাকাবাসীকে নিয়ে থানা ঘেরাওয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন খবর পান তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি নিমতলা এলাকার বিএনপির কয়েকজন নেতাকে বিষয়টি অবহিত করেন, যাতে কেউ থানার ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
তিনি আরও বলেন, আড়পাড়া এলাকার নারীরা থানার সামনে এলে জালাল ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন দলীয় নেতা-কর্মী তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ করলে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদের জেরে পেটোয়া বাহিনী দিয়ে হামলা করানো হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি জেল্লাল হোসেন বলেন, “সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার সবসময়ই ভালো সম্পর্ক। এমন ঘটনা ঘটবে, তা আমি বুঝতে পারিনি।”
ঘটনার পর সাংবাদিক মহলে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, সাংবাদিক জাতির বিবেক এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। পেশাগত দায়িত্ব পালনরত কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকারের ওপরও আঘাত।
নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে এ ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
Reporter Name 



















