ঢাকা ০৮:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ময়মনসিংহে লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস পালিত

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:০৯:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
  • ২১ Time View
Print

মোঃ রফিকুল ইসলাম রতন সিনিয়র রিপোর্টার বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে ময়মনসিংহে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর ২০২৬) জেলা প্রশাসন, ময়মনসিংহের আয়োজনে লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, সৃষ্টিকর্ম, মানবতাবাদী চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ভাবধারাকে স্মরণ করে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁই বাংলা লোকসংগীত ও দর্শনের জগতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর গান, চিন্তা ও জীবনদর্শন যুগে যুগে মানুষকে মানবতা, সাম্য, সম্প্রীতি এবং ভেদাভেদহীন সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করার যে শিক্ষা লালন সাঁই তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে দিয়ে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকারের সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য মোঃ আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ রুকুনোজ্জামান রোকন। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সাহাবউদ্দিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সাইফুর রহমান। আলোচনা সভায় বক্তারা ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, লালন সাঁইয়ের দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল মানবপ্রেম, আত্মোপলব্ধি এবং মানুষের মধ্যে বিদ্যমান কৃত্রিম বিভেদ দূর করা। তাঁর গান ও বাণীতে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তা, আত্মপরিচয়, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে গভীর জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে। বক্তারা আরও বলেন, লালন সাঁই কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে মানুষকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর সৃষ্টিতে মানুষের পরিচয়, মানবিকতা ও মনুষ্যত্ব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভেদ অতিক্রম করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার যে আহ্বান তাঁর গানে প্রতিফলিত হয়েছে, তা বর্তমান সমাজেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁরা উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি এবং বিভাজনমূলক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী দর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের জীবন, সমাজ, আত্মপরিচয় ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। বক্তারা বলেন, ফকির লালন সাঁইয়ের কালজয়ী সৃষ্টি বাংলা লোকসংগীত ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। লোকজ সুর, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং জীবনমুখী দর্শনের সমন্বয়ে তাঁর সৃষ্টিকর্ম বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। লালন সাঁইয়ের গানের মধ্যে নিহিত জীবনবোধ, মানবিক চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন বলেও মত দেন বক্তারা। তাঁরা মনে করেন, দেশের সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ, চর্চা ও বিকাশের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। তাঁদের মতে, লালন সাঁইয়ের দর্শন শুধু অতীতের স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও তা একটি মূল্যবান দিকনির্দেশনা। তাঁর সৃষ্টিকর্মের যথাযথ চর্চা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। আলোচনা সভা শেষে বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের গান ও লোকজ সংস্কৃতির আবহে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। লালনের গানের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনদর্শন, মানবপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ধারা ও লালন সাঁইয়ের সৃষ্টিকর্মের আবেদন নতুন করে উপস্থাপিত হয়। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর মানবতাবাদী চিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণের আহ্বান জানানো হয়। আয়োজকরা মনে করেন, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে দেশের লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণ, লালন সাঁইয়ের সৃষ্টিকর্মের চর্চা এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও জোরদার হবে। ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এ আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে লালনচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

লাকসামে ধানখেত থেকে অটোরিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার

ময়মনসিংহে লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস পালিত

Update Time : ০৫:০৯:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
Print

মোঃ রফিকুল ইসলাম রতন সিনিয়র রিপোর্টার বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে ময়মনসিংহে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর ২০২৬) জেলা প্রশাসন, ময়মনসিংহের আয়োজনে লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন, সৃষ্টিকর্ম, মানবতাবাদী চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ভাবধারাকে স্মরণ করে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁই বাংলা লোকসংগীত ও দর্শনের জগতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর গান, চিন্তা ও জীবনদর্শন যুগে যুগে মানুষকে মানবতা, সাম্য, সম্প্রীতি এবং ভেদাভেদহীন সমাজ গঠনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করার যে শিক্ষা লালন সাঁই তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে দিয়ে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকারের সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ সদর আসনের সংসদ সদস্য মোঃ আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ রুকুনোজ্জামান রোকন। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সাহাবউদ্দিন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সাইফুর রহমান। আলোচনা সভায় বক্তারা ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, লালন সাঁইয়ের দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল মানবপ্রেম, আত্মোপলব্ধি এবং মানুষের মধ্যে বিদ্যমান কৃত্রিম বিভেদ দূর করা। তাঁর গান ও বাণীতে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তা, আত্মপরিচয়, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে গভীর জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে। বক্তারা আরও বলেন, লালন সাঁই কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে মানুষকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর সৃষ্টিতে মানুষের পরিচয়, মানবিকতা ও মনুষ্যত্ব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভেদ অতিক্রম করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার যে আহ্বান তাঁর গানে প্রতিফলিত হয়েছে, তা বর্তমান সমাজেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁরা উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি এবং বিভাজনমূলক মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী দর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের জীবন, সমাজ, আত্মপরিচয় ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। বক্তারা বলেন, ফকির লালন সাঁইয়ের কালজয়ী সৃষ্টি বাংলা লোকসংগীত ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। লোকজ সুর, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং জীবনমুখী দর্শনের সমন্বয়ে তাঁর সৃষ্টিকর্ম বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। লালন সাঁইয়ের গানের মধ্যে নিহিত জীবনবোধ, মানবিক চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন বলেও মত দেন বক্তারা। তাঁরা মনে করেন, দেশের সমৃদ্ধ লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ, চর্চা ও বিকাশের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। তাঁদের মতে, লালন সাঁইয়ের দর্শন শুধু অতীতের স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও তা একটি মূল্যবান দিকনির্দেশনা। তাঁর সৃষ্টিকর্মের যথাযথ চর্চা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। আলোচনা সভা শেষে বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের গান ও লোকজ সংস্কৃতির আবহে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। লালনের গানের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনদর্শন, মানবপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ধারা ও লালন সাঁইয়ের সৃষ্টিকর্মের আবেদন নতুন করে উপস্থাপিত হয়। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে লালন সাঁইয়ের জীবনদর্শন ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর মানবতাবাদী চিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণের আহ্বান জানানো হয়। আয়োজকরা মনে করেন, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে দেশের লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণ, লালন সাঁইয়ের সৃষ্টিকর্মের চর্চা এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও জোরদার হবে। ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এ আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে লালনচর্চা, মানবিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।